26.9 C
আবহাওয়া
৭:০৪ অপরাহ্ণ - ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » কেমন হবে বিএনপির মুক্তাদির ও জামায়াতের হাবিবুরের ভোটের লড়াই?

কেমন হবে বিএনপির মুক্তাদির ও জামায়াতের হাবিবুরের ভোটের লড়াই?


বিএনএ, ঢাকা: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দেশের রাজনীতিতে সিলেটকে নিয়ে এক ধরনের ‘মিথ’ প্রচলিত আছে। সিলেট-১ আসনে যে দল বিজয়ী হয় সেই দলই সরকার গঠন করে বলে বিশ্বাস অনেকের। অর্থাৎ সিলেট-১ আসনটি যার সরকারও তার। হযরত শাহজালাল (রহ:) ও হযরত শাহপরাণ (রহ:)সহ ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতি বিজড়িত পূণ্যভূমির এই আসনটি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ সব দলের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

YouTube player

মূলত এই জনশ্রুতিকে মাথায় রেখে মাজার জিয়ারত এবং জনসভার মধ্যে দিয়ে সিলেট থেকেই শুরু হয় সব দলের নির্বাচনি প্রচারণা। সরকার গঠন করার বিষয়টি মাথায় রেখে মর্যাদাপূর্ণ এ আসনে শক্তিশালী প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়।

জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এবং খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচন থেকে সব কয়টি নির্বাচনে সিলেটে থেকেই নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিলেন।

সেই ধারাবাহিকতা, তারেক রহমানও বজায় রেখেছেন। হযরত শাহজালাল (রহ:) এবং হযরত শাহপরাণ (রহ:) এর মাজার জিয়ারত করার মাধ্যমে বিএনপির নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু করেছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ২২ বছর পর তিনি সিলেট সফর এসেছেন। ২০০৪ সালে তারেক রহমান যখন সিলেট জেলা বিএনপির কর্মী সম্মেলনে এসেছিলেন তখন তিনি ছিলেন দলের যুগ্ম মহাসচিব। তারেক রহমান বুধবার রাতে সিলেট এসে পৌছান এবং হযরত শাহজালাল (রহ:) ও হযরত শাহপরাণ (রহ:) এর মাজার জিয়ারত শেষে সিলেট-৩ সংসদীয় আসনের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের বিরাইমপুর গ্রামে, তার শ্বশুরবাড়িতে যান।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বিএনপি চেয়ারপাসন যখন চৌহাট্টা এলাকার সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে উপস্থিত হন, তখন লাখ লাখ মানুষ আগামীর সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীকে শ্লোগান, প্লেকার্ড, ব্যানার ফেস্টুনের মাধ্যমে স্বাগত জানান। বিশাল এ নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান আরো বলেছেন, তরুণ প্রজন্মকে আগামীর বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে। সব ধর্মের মানুষ মিলে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ধানের শীষে ভোট দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, সিলেট-১ (সদর) আসনে ৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বতা করছেন। এদের মধ্যে ধানের শীষে বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, দাঁড়িপাল্লায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মাওলানা হাবিবুর রহমান, হাতপাখায় ইসলামী আন্দোলনের মাহমুদুল হাসান, ট্রাকে গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন, মই নিয়ে বাসদের প্রণব জ্যোতি পাল, কাস্তে প্রতীকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন আপেল, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো: শামীম মিয়া ও কাঁচি প্রতীকে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল সঞ্চয় কান্ত দাস।

আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে মূল লড়াই হবে বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও জামায়াতে ইসলামী মাওলানা হাবিবুর রহমানের মধ্যে। কেমন হবে এই দুইজনের নির্বাচনী লড়াই? সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন জেনে নি- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত সিলেট-১ (সদর) আসনের ৪টি সংসদ নির্বাচনের ফলাফল।

সিলেট-১ সংসদীয় আসনটি সিলেট সিটি কর্পোরেশন ও সিলেট সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত। এটি জাতীয় সংসদের ২২৯ তম আসন।

১৯৯১ সালের ২৭ই ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই আসনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৯০ হাজার ৭ শত ৪৬ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৪ জন। নির্বাচনে বিএনপির খন্দকার আবদুল মালেক বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৩৭ হাজার ৯০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের ইফতেখার হোসেন শামীম। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৩৫ হাজার ৪ শত ৭০ ভোট ।

১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৭৫ হাজার ১ শত ২৫ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৮৩ হাজার ২ শত ৮০ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৫৯ হাজার ৭ শত ১০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির এম সাইফুর রহমান । ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৫৮ হাজার ৯ শত ৯০ ভোট।

২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৬ শত ৯৭ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ৫০ হাজার ৩ শত ২৪ জন। নির্বাচনে বিএনপির এম সাইফুর রহমান বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮ শত ২৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের আবুল মাল আব্দুল মুহিত । নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৯৫ হাজার ৮৯ ভোট।

২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ৯ হাজার ৬ শত ৭৭ জন। ভোট প্রদান করেন ৩ লাখ ২৫ হাজার ৭০ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আবুল মাল আব্দুল মুহিত বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৭২ হাজার ৮ শত ১৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির এম সাইফুর রহমান । ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৩৫ হাজার ২ শত ১০ ভোট।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পঞ্চম, ও অষ্টম সংসদে বিএনপি , সপ্তম ও নবম সংসদে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়।

এবার আসা যাক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনে সিলেট-১ (সদর) আসনে রাজনৈতিক দলগুলো কত শতাংশ ভোট পেয়েছিল সেই বিশ্লেষণে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সিলেট-১ সংসদীয় আসনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৪০.২৬% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩০.৩০%, বিএনপি ৩১.৬৯%, জামায়াত ইসলামী ১৪.৯৬% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ২৩.০৫% ভোট পায়।

১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬৬.৬২% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩২.৫৮%, বিএনপি ৩২.১৯% জাতীয় পাটি ২১.৯২%, জামায়াত ইসলামী ৯.৮৪% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ৩.৪৭% ভোট পায়।

২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬৭.৮৯% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৭.৯৯%, ৪ দলীয় জোট ৫৩.৪৬%, জাতীয় পাটি ৬.৮৩%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ১.৭২% ভোট পায়।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৬.৮০% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ১৪ দলীয় জোট ৫৪.৯৫%, ৪ দলীয় জোট ৪৩.১৮% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ১.৮৭% ভোট পায়।

এবার আসা যাক, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সিলেট-১ আসনে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেমন ছিল? কারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন?

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে র্নিবাচনের দাবিতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেনি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৫ লাখ ৪৪ হাজার ২ শত ১৯ জন। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ১০ জন। নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের আব্দুল মোমেন, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রেদওয়ানুল হক চৌধুরী, বটগাছ প্রতীকে খেলাফত আন্দোলনের নাসির উদ্দীন, কোদাল প্রতীকে বাংলাদেশ বিপ্লবী ওযার্কার্স পার্টির উজ্জল রায়, মই প্রতীকে সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের প্রনব জ্যোতি পাল, মিনার প্রতীকে ইসলামী ঐক্যজোটের মুহাম্মদ ফয়জুল হক, আম প্রতীকে ন্যশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপির ইউসুফ আহমেদ এবং হারিকেন প্রতীকে মুসলীম লীগের আনোয়ার উদ্দীন বোরহানাবাদী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।

কিন্তু নির্বাচনের আগের রাতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর লোকজন প্রশাসনের যোগসাজসে ৩০-৪০ শতাংশ ব্যালটে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে রাখে।কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখান করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আব্দুল মোমেন বিজয়ী ঘোষণা করা হয় ।

২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত ইসলামীসহ তাদের সমমনা দল গুলো নির্বাচন বর্জন করে। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিতের ছোট ভাই ড. এ কে আব্দুল মোমেনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি। নিবন্ধন স্থগিত থাকায় এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোন প্রার্থী নেই। বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, দাঁড়িপাল্লায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মাওলানা হাবিবুর রহমানের মধ্যে হবে ভোটের লড়াই।

তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই আসনটি একক কোন রাজনৈতিক দলের ঘাঁটি নয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সাংগঠনিক অবস্থা সমানে সমান। জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান তৃতীয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর দলটি সাংগঠনিকভাবে বেশ শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু তা সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার মতো নয়। ‘নো বোট নো ভোট’ কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগ। ফলে আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ ভোটারা কেন্দ্রে যাবে না। যারা যাবে তারা ধানের শীষের ব্যালটে সিল মারবে।

সব মিলিয়ে ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতি বিজড়িত পূণ্যভূমির সংসদীয় আসন সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানকে বিপুল ভোট পরাজিত করার সম্ভাবণা রয়েছে বলে মনে করেন দৈবচয়ন পদ্বতিতে বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোর এর পরিচালিত বেশিরভাগ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সৈয়দ সাকিব

Loading


শিরোনাম বিএনএ