বিএনএ, ঢাকা: ১১ দলীয় জোট থেকে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বেরিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল বরিশাল-৫ (সদর) আসন। এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী দলটির সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করিম অন্যতম দাবিদার। কিন্তু এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলালের মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। শুরু থেকেই এই আসনটি ইসলামী আন্দোলন নিজেদের দাবি করে আসছিল। তাদের যুক্তি ছিল—দলটির আমীরের বাড়ি এই এলাকায় হওয়ায় আসনটি তাদের পাওয়াই যুক্তিসংগত।
এক সংবাদ সম্মেলনে মুফতি ফয়জুল করিম সরাসরি বলেন, “ এটি আমীরের আসন, সেহেতু অন্য কারো দাবি অযৌক্তিক।” কিন্তু মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে বরিশাল-৫ (সদর) আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ালেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন (হেলাল)।
কেন্দ্রীয় জামায়াতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর প্রতি সম্মান জানিয়ে দলটি মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। জামায়াতের এমন সিদ্ধান্তের নেপথ্য রহস্য কী তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তোলপাড় চলছে।
প্রসঙ্গত. এই আসনে ৬ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করিম ও বিএনপি’র চারবারের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ারের মধ্যে সরাসরি লড়াই হবে। কেমন হবে তাদের দুই জনের লড়াই? সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন জেনে নিই- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল।
বরিশাল-৫ সংসদীয় আসনটি বরিশাল সিটি কর্পোরেশন ও বরিশাল সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত। এটি জাতীয় সংসদের ১২৩তম আসন। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সংসদ নির্বাচনের সময় গঠিত হয় এই আসনটি।
১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই আসনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৪৮ হাজার ৮ শত ৯৯ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ১৯ হাজার ১ শত ৯৪ জন। নির্বাচনে বিএনপির আব্দুর রহমান বিশ্বাস বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৫২ হাজার ৯৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ২৮ হাজার ৭ শত ৫ ভোট। ৮ই অক্টোবর আব্দুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত উপ নির্বাচনে বিএনপির মুজিবর রহমান সরওয়ার বিজয়ী হন।
১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ১০ হাজার জন। ভোট প্রদান করেন ১লাখ ৫৪ হাজার ৭ শত ৪৯ জন। নির্বাচনে বিএনপির ডা. এহতেশামুল হক নাসিম বিশ্বাস বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৭০ হাজার ৮ শত ৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৪২ হাজার ৯ শত ২২ ভোট।
২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৮৫ হাজার ৪০ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৮১ হাজার ৭ শত ৩৪ জন। নির্বাচনে বিএনপির মজিবর রহমান সরওয়ার বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৮ হাজার ৪ শত ১২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের শওকত হোসেন হিরন । নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৫২ হাজার ৩ শত ৮৫ ভোট।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৯২ হাজার ৬৭ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ৩৬ হাজার ১ শত ৬০ জন। নির্বাচনে বিএনপির মজিবুর রহমান সরওয়ার বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৪ হাজার ৫ শত ৪২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের জাহিদ ফারুক। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৯৮ হাজার ৬ শত ৪১ ভোট।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম ও নবম সংসদে টানা বিএনপি বিজয়ী হয়। ৪টি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হতে পারেনি। তবে প্রতিটি নির্বাচনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল আওয়ামী লীগ প্রার্থী। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বিজয়ী হওয়া দূরে থাক কোন নির্বাচনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বতায়ও ছিল না।
এবার আসা যাক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনে বরিশাল-৫ (সদর) আসনে রাজনৈতিক দলগুলো কত শতাংশ ভোট পেয়েছিল সেই বিশ্লেষণে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বরিশাল-৫ সংসদীয় আসনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৪৭.৮৯% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৪.০৮%, বিএনপি ৪৩.৭১%, জাতীয় পার্টি ১৯.১৮%, জামায়াতে ইসলামী ৪.৭৯% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ৮.২৪% ভোট পায়।
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৩.৬৯% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৭.৭৪%, বিএনপি ৪৫.৭৫%, জাতীয় পাটি ২০.১০%, জামায়াত ইসলামী ৩.০২% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ৩.৩৯% ভোট পায়।
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬৩.৭৬% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৮.৮২%, ৪দলীয় জোট ৫৯.৬৫%,জাতীয় পার্টি ১১.৩১%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.২২% ভোট পায়।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৮০.৪৩% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ১৪ দলীয় জোট ৪২.০৭%, ৪দলীয় জোট ৪৪.৭৪%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ১৩.১৯% ভোট পায়।
আসুন এবার জেনে নিই, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বরিশাল-৫ আসনের দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেমন ছিল? কারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন?
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শওকত হোসেন হিরণ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় বিজয়ী হন। ২০১৪ সালের ৯ই এপ্রিল শওকত হোসেন হিরণ আকস্মিক মৃত্যু বরণ করেন। পরবর্তীতে উপনির্বাচনে তার স্ত্রী জেবুন্নেসা আফরোজ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়।
২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল জাহিদ ফারুক শামীম, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির মজিবুর রহমান সরওয়ার, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের সৈয়দ মো. ফয়জুল করিমসহ ৭জন প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। কিন্তু ভোটের আগের দিন রাতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর অনুসারিরা নৌকা প্রতীকে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তিকরে রাখে। কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখান করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জাহিদ ফারুককে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি না মানায় আওয়ামী লীগের দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপি- জামায়াত ইসলামী সহ তাদের সমমনা দলগুলো অংশগ্রহণ করেনি। আমি ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ভোটারবিহীন এক তরফা এই আমি-ডামির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী জাহিদ ফারুক শামীমকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।বরিশাল সদর ও সিটি করপোরেশন নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মো. মজিবর রহমান সরওয়ার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি সৈয়দ মো. ফয়জুল করীম, বাসদের মনীষা চক্রবর্তী, জামায়াতে ইসলামীর মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, জাতীয় পার্টির আখতার রহমান, এবি পার্টির মো. তারিকুল ইসলাম, এনসিপির আব্দুল হান্নান সিকদার এবং বাসদ (মার্কসবাদী) দলের সাইদুর রহমানের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু মনোনয়ন প্রত্যাহারের দিন চমক দেখিছে জামায়াত ইসলামী প্রার্থী মুয়াযযম হোসাইন হেলাল। তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি সৈয়দ মো. ফয়জুল করীমের সমর্থনে মনোনয়ন প্রত্যাহার কর নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠেছে, যে আসন জটিলতায় ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে একবাক্স নীতির ১১ দলীয় জোট ভেঙ্গে গেছে, সেই আসন থেকে কেন জামায়াত ইসলামী প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে নির্দেশনা দেওয়া হলো। এই নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নড়েচড়ে বসেছে। অনেকে এটিকে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে দেখছে। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে। যা ফলাফলকে উলটপালট করে দিতে পারে। কিন্তু প্রার্থী না থাকায় দলটির নেতাকর্মীরা ভোট কেন্দ্রে যাবে কীনা কিংবা গেলেও হাতপাখায় সিল মারবেন কীনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা বিএনপির মতো শক্ত না হলেও দলটির বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। যা জয়-পরাজয়ের বড় ফ্যাক্টর। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না।ফলে দলটি ‘নো বোট, নো ভোট’ পলিসি গ্রহণ করেছে। যা বিএনপির প্রার্থীকে বাড়তি সুবিধা দেবে।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরিশাল-৫ (সদর) আসনটি দক্ষিণাঞ্চলের মর্যাদার আসন হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৭৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কোনো সংসদ নির্বাচনে এ আসনটিতে জয় পায়নি আওয়ামী লীগ। ফলে আসনটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। তাছাড়া বিগত নির্বাচনগুলোর ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণে মজিবর রহমান সরোয়ার সবসময় প্রভাবশালী প্রার্থী ছিলেন। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি এই আসন থেকে চারবার এমপি ও একবার সিটি মেয়র নির্বাচিত হন।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের ১২৩ তম বরিশাল- ৫ সংসদীয় আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি ফয়জুর করীমকে বিপুল ভোটে পরাজিত করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোরের পরিচালিত জরিপে অংশগ্রহণকারি বেশিরভাগ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()
