26 C
আবহাওয়া
৬:১৪ অপরাহ্ণ - ডিসেম্বর ৬, ২০২৫
Bnanews24.com
Home » কেমন হবে এনসিপির হাসনাত- জামায়াতের শহীদ ও বিএনপির মুন্সীর লড়াই!

কেমন হবে এনসিপির হাসনাত- জামায়াতের শহীদ ও বিএনপির মুন্সীর লড়াই!


বিএনএ, ঢাকা : কুমিল্লায় সংসদীয় আসন রয়েছে ১১টি। এর মধ্যে কুমিল্লা-৪ আসন এখন আলোচনা এখন তুঙ্গে। কেননা এখান থেকে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ নির্বাচন করবেন। গত বৃহস্পতিবার এনসিপি থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছে। ঘোষণা করেছেন নিজের প্রার্থীতা।

বিএনপি এখানে প্রার্থী করেছে উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীকে। এই আসন থেকে এখন পর্যন্ত তিনবার নির্বাচন করে তিনবারই বিজয়ী হয়েছেন তিনি। তবে বিএনপির শক্ত অবস্থান থাকলেও এই আসনে দলের মধ্যে অন্তর্কোন্দল ও গ্রুপিংও রয়েছে।

এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী কুমিল্লা উত্তর জেলার সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম (শহীদ)। নিজের ভোটের পাল্লা ভারী করতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তিনি।

কুমিল্লা-৪ আসনে কেমন হবে এই তিন জনের ভোটের লড়াই? এর উত্তর রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি সংসদ নির্বাচন ফলাফলে।

এবার আসা যাক,সেই বিশ্লেষণে। কুমিল্লা-৪ সংসদীয় আসনটি দেবিদ্বার উপজেলা নিয়ে গঠিত। এটি জাতীয় সংসদের ২৫২ তম আসন।

১৯৯১ সালের ২৭ই ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই আসনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ১৮ হাজার ৯ শত ৪৩ জন। ভোট প্রদান করেন ৯২ হাজার ৫ শত ৩ জন। নির্বাচনে বিএনপির ইঞ্জিঃ মন্জুরুল আহসান বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ২৭ হাজার ১ শত ৩৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ। কুঁড়েঘর প্রতীকে তিনি পান ২৬ হাজার ২ শত ৯৯ ভোট ।

১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগসহ সব বিরোধী দল এই নির্বাচন শুধু বর্জন করে ক্ষান্ত হয়নি, প্রতিহতও করে। নির্বাচনে বিএনপি,ফ্রিডম পার্টি এবং কিছু নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল, অখ্যাত ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। এই নির্বাচনে বিএনপির ইঞ্জিঃ মন্জুরুল আহসানকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১১ দিন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ হওয়ার পর এই সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩ শত ১৩ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ২৬ হাজার ৮ শত ৭৩ জন। নির্বাচনে বিএনপির ইঞ্জিঃ মন্জুরুল আহসান বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৪৬ হাজার ১ শত ৩৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টির এবি এম গোলাম মোস্তফা। লাঙ্গল প্রতীকে তিনি পান ৩৯ হাজার ২ শত ৯ ভোট।

২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৪১ হাজার ৩ শত ২১ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৫৫ হাজার ৬ শত ৯৫ জন। নির্বাচনে বিএনপির ইঞ্জিঃ মন্জুরুল আহসান বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৯২ হাজার ৩ শত ২৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের ফখরুল ইসলাম মুন্সী। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৫৮ হাজার ৮ শত ৭৭ ভোট।

২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৩১ হাজার ৮ শত ৪০ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ১ হাজার ৯ শত ৩১ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এবি এম গোলাম মোস্তফা বিজয়ী হন । নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ১৫ হাজার ৫৭ ভোট।

মামলাজনিত কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী আসনটিতে প্রার্থী হতে পারেনি। তাঁর স্ত্রী মাজেদা আহসান বিএনপির প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৮১ হাজার ৬ শত ৬৪ ভোট।

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে র্নিবাচনের দাবিতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেনি। স্বতন্ত্র প্রার্থী রাজী মোহাম্মদ ফখরুল বিজয়ীকে ঘোষণা করা হয়।

২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ৬ জন। নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, ধানের শীষ প্রতীকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির আবদুল মালেক রতন, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহসিন আলম, গোলাপ ফুল প্রতীকে জাকের পার্টির আব্দূল হালিম, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির ইকবাল হোসেন রাজু এবং মিনার প্রতীকে ইসলামী ঐক্যজোটের মো: বিন ইয়ামিন সরকার প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।

কিন্তু ভোটের আগের দিন রাতে প্রশাসনের যোগসাজসে বিভিন্ন কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে ব্যালেট বক্স ভর্তি করে রাখা হয়।কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখান করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের রাজী মোহাম্মদ ফখরুল বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম সংসদে বিএনপি, নবম সংসদে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনএ নিউজ টুয়েন্টি ফোর এর গবেষণা টিম দৈবচয়ন পদ্ধতিতে সারাদেশে জরিপ চালায়। জরিপে অংশগ্রহণকারি বেশীরভাগ ভোটার ১৯৯১ সালের পঞ্চম, ১৯৯৬ সালের সপ্তম, ২০০১ সালের অষ্টম ও ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরেপক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। তারই ভিত্তিতে বিএনএ নিউজ টুয়েন্টি ফোর কুমিল্লা-৪ আসনে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম ও নবম এই ৪টি নির্বাচনের প্রদত্ত ভোটের পরিসংখ্যানকে মানদন্ড ধরে আওয়ামী লীগ,বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত ইসলামীর সাংগঠনিক শক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি কল্পানুমান উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কুমিল্লা-৪ সংসদীয় আসনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৪২.২৫% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৮.৪৩%, বিএনপি ২৯.৩৪%, জাতীয় পাটি ০.৩৬%, জামায়াত ইসলামী ১৫.৫৯% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ২৬.২৮% ভোট পায়।

১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৩.২০% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৬.৪৯%, বিএনপি ৩৬.৩৬% জাতীয় পাটি ৩০.৯০%, জামায়াত ইসলামী ৫.৭১% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৫৪% ভোট পায়।

২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬৪.৫২% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৭.৮২%, ৪ দলীয় জোট ৫৯.৩০%, জাতীয় পাটি ২.০৫%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৮৩% ভোট পায়।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৮৫.৭৭% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ১৪ দলীয় জোট ৫৭.৮৬%, ৪ দলীয় জোট ৪০.৯২% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ১.২২% ভোট পায়।
#
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনটি স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সংসদ থেকে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি ছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা মাধ্যমে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়। জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে বিএনপির ভূমিধস বিজয় হয়। তখনও এই আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হয়।

জেনারেল এরশাদ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত দু’টি নির্বাচনে জাতীয় পাটি প্রার্থী বিজয়ী হয়। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এই আসনটি চলে যায় বিএনপির দখলে। ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা ৪বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী।

২০০৮ সালের পর থেকে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে আওয়ামী লীগ গত ১৫ বছর চড়ি ঘুরালেও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দলটির সাবেক এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুলসহ স্থানীয় নেতারা পলাতক। যারা আছেন তারা নিরব। এছাড়া আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। ফলে ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী এবং জামায়াত ইসলামী দলের কুমিল্লা উত্তর জেলার সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম (শহীদ) মধ্যে লড়াই সীমাবদ্ধতা থাকবে। গুঞ্জন আছে, এই আসনে এনসিপির হাসনাত আব্দুল্লাহকে সমর্থন জানিয়ে দলীয় প্রার্থী প্রত্যাহার করতে পারে। সেই ক্ষেত্রে ‘ধানের শীষ’ এর প্রতিদ্বন্দ্বি হতে পারে ‘শাপলা কলি’। তবে লড়াইটা হবে অসম। বিএনপির সঙ্গে লড়াই করার শক্তি সার্মথ এনসিপির নেই। হাসনাত আব্দুল্লাহ যতটা পরিচিত গণমাধ্যমে. ততটা অপরিচিত তৃণমূল পর্যায়ের ভোটারদের কাছে। তাছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি তথা এনসিপির সাংগঠনিক ভিত্তি নেই।

এলাকারা ভোটারা মনে করেন, এনসিপি যদি বড় কোন দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট না করে তাহলে হাসনাত আব্দুল্লাহ’র জামানত বাজেয়াপ্ত হতে পারে।

লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামীর মধ্যে সরাসরি লড়াই হবে। সেক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের ২৫২তম সংসদীয় আসন (কুমিল্লা-৪) দেবীদ্বারে বিএনপি হেসে খেলে বিজয়ী হবেন বলে মনে করেন বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোর এর দৈবচয়ন পদ্ধতির জরিপে অংশগ্রহণকারি ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ।

বিএনএনিউজ/সৈয়দ সাকিব/এইচ.এম।

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ