বিএনএ, ডেস্ক : গত বছরের ১০শে ডিসেম্বর অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনে দায়িত্বপালনকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে না, বিশ্ববাসীর কাছেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। হয়েছেও তাই!
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ২ হাজার ৩৩৪ জন। এর মধ্যে গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০.২৬ শতাংশ। ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন এবং ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। এছাড়া প্রদত্ত গণভোটের মধ্যে বাতিল বা অবৈধ হয়েছে ৭৪ লাখ ২ হাজার ২৮৫টি ভোট। এত বাতিল ভোটের ইতিহাস আগে দেখা যায়নি।

সদ্য অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৬২.৪৭ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে এবং ২৯.৩২ শতাংশ ‘না’ এর পক্ষে ভোট পড়েছে। দ্বিগুণেরও বেশি ভোট নিয়ে দেশব্যাপী ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রকাশিত গণভোটের ফলাফল ও হিসাব নিয়ে বড় ধরণের গরমিল খুঁজে পেয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ।
প্রতিবেদনে বলাহয়, নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া গণভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাজশাহী-৪ আসনে গণভোট কাস্ট হয়েছে ২৪৪.২৯৫ শতাংশ। যেখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯০৯ জন, কিন্তু সেখানে ভোট কাস্ট দেখানো হয়েছে ৭ লাখ ৮১ হাজার ৫২৩টি। এই আসনে ‘না’ ভোটের পক্ষে পড়েছে ৬ লাখ ১২ হাজার ২২৯ ভোট এবং ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে পড়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮২ ভোট। উল্লেখ্য, এই আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবদুল বারী সরদার।
এছাড়া সিরাজগঞ্জ-১ আসনে গণভোট পড়ার হার দেখানো হয়েছে মাত্র ৭.৮৯৯ শতাংশ। যা একই দিনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের কাস্টিং ভোটের তুলনায় অনেক কম। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ভোট পড়েছে ৬০.৮৩ শতাংশ। এই আসনে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬১৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি প্রার্থী সেলিম রেজা।
এ দিকে নেত্রকোনা-৩, নেত্রকোনা-৪ এবং নেত্রকোনা-৫ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা ওই আসনগুলোর মোট ভোটারের চেয়েও বেশি দেখানো হয়েছে। নেত্রকোনা-৩ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২০ হাজার ৬৮৬ জন হলেও ‘হ্যাঁ’ তে ভোট পড়েছে ৫ লাখ ২ হাজার ৪৩৮টি। অথচ সেখানে প্রদত্ত মোট ভোটের সংখ্যার স্থলে দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫৮ ভোট এবং কাস্টিং ভোট দেখানো হয়েছে ৫৬.৬৫৯ শতাংশ। নেত্রকোনা-৪ ও নেত্রকোনা-৫ আসনেও একইভাবে তথ্যের গরমিল রয়েছে।
২৯৯টি আসনের মধ্যে মোট ১১টি আসনে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে পার্বত্য তিন জেলার সবকটি (৩টি) এবং গোপালগঞ্জের সবকটি (৩টি) আসনে ‘না’ জয়ী হয়েছে। খাগড়াছড়ি আসনে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে পড়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৫৫ ভোট এবং ‘না’ এর পক্ষে পড়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪২ ভোট। রাঙামাটি আসনে ‘হ্যাঁ’ এর চেয়ে ‘না’ ভোট ১ লাখ ৮ হাজার ১০৬টি বেশি পড়েছে। একইভাবে বান্দরবানেও ‘না’ ভোট ১৮ হাজার ৭৩৯টি বেশি পড়েছে।
আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জের তিনটি আসনেই ‘হ্যাঁ’ এর চেয়ে প্রায় তিন গুণ ভোট পড়েছে ‘না’ তে। গোপালগঞ্জ-১ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৫৪ হাজার,৭ মত ১৬টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ১ লাখ ২৮,২শত ৯৮টি। গোপালগঞ্জ-২ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট ৩৪হাজার ৩০২টি এবং ‘না’ ভোট ১লাখ ৭ হাজার ২শত ৯০টি। গোপালগঞ্জ-৩ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট ৩৩ হাজার৪ শত ৯৮টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ৯৩ হাজার ৩শত ৬৮টি।
এছাড়া অন্য যে আসনগুলোতে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে সেগুলো হলো— ঝিনাইদহ-১, সুনামগঞ্জ-২, চট্টগ্রাম-৮, চট্টগ্রাম-১২ এবং রাজশাহী-৪। ‘না’ ভোট বেশি পাওয়া এই ১১টি আসনের মধ্যে ১০টিতেই বিএনপির প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হিসেবে জয়ী হয়েছেন। শুধুমাত্র রাজশাহী-৪ আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াত প্রার্থী।
নির্বাচন কমিশন শুক্রবার রাতে সিরাজগঞ্জ-১ ও রাজশাহী-৪ আসনের গণভোটের ফলাফল পরিবর্তন করে নতুন ফল প্রকাশ করলেও নেত্রকোনা-৩, নেত্রকোনা-৪, ও নেত্রকোনা-৫ আসনের ফলাফল অপরিবর্তিত অবস্থায় অসামঞ্জস্যপূর্ণই থেকে যায়। সংশোধিত ফলে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এতে শতকরা হার ও ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা বেড়েছে। কমেছে ‘না’ ভোটের সংখ্যা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সারাদেশে সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত করতে গিয়ে ভোট কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্তরা হ-য-ব-র- পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ফলে সমালোচনার উর্ধে উঠতে পারেনি ঐতিহাসিক এই নির্বাচন।
সৈয়দ সাকিব
![]()

