বিএনএ, ঢাকা: জুলাই আন্দোলন পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মপ্রকাশ করার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ ডাকসু ও হল সংসদে নির্বাচনে নিরন্কুশ জয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছে। এর মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিকভাবে বড় পরাজয় হয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের। নির্বাচনে পরিকল্পিত কারচুপির অভিযোগ করেছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম এবং স্বতন্ত্র ঐক্য প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের ফলাফল মেনে নিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের এমন ভূমিধস বিজয়কে জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির সেজদাহ দিয়ে উদযাপন করেছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ থাকায় স্বাধীতার ৫৪ বছর এই প্রথম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। ছাত্রলীগ বিহীন এবারের ডাকসু নির্বাচনে অনেকটা বিনা বাধায় ছাত্রশিবির জয়ী হয়ে রের্কড গড়েছেন। এর মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হলগুলোতে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের পাশাপাশি প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।একই সঙ্গে স্বাধীনতার পক্ষে-বিপক্ষে একটি স্পস্ট বিভাজন রেখা তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
চলুন, এবার জেনে নেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতের ডাকসু’র নির্বাচনের ইতিবৃত্ত।
১৯২১ সালের পহেলা জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়। ওই বছরই স্যার এ. এফ. রহমানের উদ্যোগে মুসলিম হল, জগন্নাথ হল ও ঢাকা হলে ছাত্র সংসদ গঠন করা হয়।
১৯২২-২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ গঠিত হয়। প্রত্যেক হল থেকে তিন জন করে ছাত্র এবং একজন শিক্ষক, আর উপাচার্যের মনোনীত একজন শিক্ষক—এদের নিয়ে গঠিত হয় ছাত্র সংসদ। তখন শিক্ষকদের মধ্যে একজন সভাপতি হতেন। ১৯২৩ সালে ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত ৩৭ বার ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
১৯৭১ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ১৯ বার নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ৭ বার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীরা ডাকসুর শীর্ষ পদে জায়গা পাননি। বরাবরই জয়ী হয়েছেন বিরোধী দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীরা।
১৯৭২ সালের ডাকসুর ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হন তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী, বর্তমানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস নির্বাচিত হন মাহবুবুর জামান।
১৯৭৩ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ প্যানেল দেয়। ছাত্র ইউনিয়নের নূহ-উল আলম লেলিন ভিপি, মুজিববাদী ছাত্রলীগের ইসমত কাদির গামা জিএসপদে প্রার্থী ছিলেন, অপরদিকে জাসদ ছাত্রলীগের ভিপি ও জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আ. ফ. ম মাহবুবুল হক ও জহিরুল ইসলাম। সারাদিন সুষ্ঠভাবে ভোট গ্রহণ হলেও সন্ধ্যায় গননা কালে বিদ্যুৎ বন্ধ করে অস্ত্রের মূখে ভোট ব্যালট ছিনতাই করা হয়।
এই ঘটনার জন্য জাসদ ছাত্রলীগ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে দায়ি করে। কর্তৃপক্ষ ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত করে। এর প্রায় ৬ বছর পর ১৯৭৯ সালে জাসদ-ছাত্রলীগের প্যানেলে ভিপি হয়েছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না এবং জিএস হন আখতারুজ্জামান।
১৯৮০ সালে মাহমুদুর রহমান মান্না দ্বিতীয়বারের মতো ভিপি নির্বাচিত হন বাসদ-ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে এবং জিএস হন আখতারুজ্জামান। এরপর ১৯৮২ সালে আখতারুজ্জামান ভিপি নির্বাচিত হন এবং জিএস হন বাসদ-ছাত্রলীগের জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু।
১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকারের আমলে ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ভিপি এবং জাসদ ছাত্রলীগ থেকে মুশতাক আহমেদ জিএস নির্বাচিত হন। এই প্যানেলটি ছিল ছাত্রলীগসহ বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর একটি যৌথ প্যানেল। ১৯৯০ সালের নির্বাচনে ছাত্রদলের পূর্ণ প্যানেল জয়লাভ করে। এ সময় আমানউল্লাহ আমান ভিপি নির্বাচিত হন এবং জিএস হন খায়রুল কবির খোকন।
১৯৯০ সালের পর ১৯৯১ সালের ১৮ জুন ডাকসু নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই সময় সহিংসতার কারণে নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বিরোধিতার কারণে নির্বাচন হয়নি। ১৯৯৬ সালে অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী উপাচার্য হওয়ার পর একাধিকবার ডাকসু নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
১৯৯৮ সালে ডাকসু কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। তারপর থেকে মাঝে মাঝে ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছেন। সিনেটে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও এসেছে। কিন্তু ফলাফল শুণ্য।
২০০৫ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হলেও ছাত্রলীগের বিরোধিতার কারণে নির্বাচনটি বাস্তবায়িত হয়নি। এই সময় ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করলেও ছাত্রলীগ তার বিরোধীতা করে।
২০১২ সালে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, ধর্মঘট, কালো পতাকা মিছিল এবং ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অধিকার মঞ্চ’ তৈরি করা হয়। কিন্তু নির্বাচন হয়নি।
সর্বশেষ ২৮ বছর পর ১৯৯০ সালের পর ২০১৯ সালের নির্বাচনে সহ-সভাপতি হন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নুরুল হক নুর এবং সাধারণ সম্পাদক ছাত্রলীগেরগোলাম রাব্বানী। নির্বাচনে নুরুল হক নুর প্রায় দুই হাজার ভোটের ব্যবধানে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে পরাজিত করেন। সেসময় কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন নুর।
নানা গুজব গুঞ্জন, অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের মধ্যে কড়া নিরাপত্তা অবস্থায় অনুষ্ঠিত এবারের ডাকসু নির্বাচনে ২৮টি পদের বিপরীতে মোট ৪৭১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর মধ্যে নারী প্রার্থী আছেন ৬২ জন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)কে বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় সংসদ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা দাবি, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান কিংবা আশির দশকজুড়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি ঐতিহাসিক সংগ্রামে ডাকসু গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়েছে এবং ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের জাতীয় রাজনীতির গতিপথ বদল হয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। ডাকসু নির্বাচনের প্রভাব পড়বে, জাকসু, রাকসু, চাকসুসহ দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আর তার রেশ দেখা যাবে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১৫ বছর ছাত্রলীগের ভিতরেই গুপ্ত অবস্থায় ছাত্রশিবির বেড়ে ওঠে। যা জুলাই আন্দোলন পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ছায়ায় ক্যাম্পসে তৈরি করেছে শক্ত অবস্থান। ডাকসুর এই নির্বাচনের ফলাফল মাধ্যমে তারই প্রমাণ মিলেছে। ছাত্র শিবিরের এই জয়ের মধ্যে এক টিলে অনেক পাখি মেরেছে।
বিএনএ/সৈয়দ সাকিব, ওজি
![]()

