31 C
আবহাওয়া
৯:১৪ অপরাহ্ণ - মে ২৯, ২০২৪
Bnanews24.com
Home » ২৬ বছরের পুরোনো একটি ছবির গল্প!

২৬ বছরের পুরোনো একটি ছবির গল্প!

২৬ বছরের পুরোনো একটি ছবির গল্প!

বিএনএ’র নির্বাহী সম্পাদক ইয়াসীন হীরার ফেসবুক থেকে নেয়া: কয়েকদিন আগে পুরাতন কিছু কাগজপত্র খোঁজ করতে গিয়ে ‘দৈনিক মুক্তকন্ঠ’র একটি কপিতে চোখ আটকে গেল। দেখলাম পত্রিকার প্রথম পাতায় মুক্তকন্ঠে’র প্রকাশক ইকবাল আহমেদ এবং তৎকালীন সহকর্মী পরিবেষ্টিত একটি ছবি ছাপা হয়েছে। পত্রিকাটি ছিল ১৯৯৮ সালের ২৪ এপ্রিল সংখ্যা। ওই দিনটি ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ও স্মরণীয় একটি দিন। আজ ২৪ এপ্রিল সেই দিনটি ফিরে এসেছে।

তাই ২৬ বছর আগের এই দিনটি একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টের বিষয়ে অনুজ সাংবাদিকরা (যারা আমাকে চিনেন না, নাম শুনেননি) তাদের উদ্দেশ্যে আমার এই লেখা। তার আগে বলে রাখি, ১৯৯১ সালে দেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক নাঈমুল ইসলাম খান সম্পাদিত দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ এর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে আমার সাংবাদিকতা জগতে হাতেখড়ি। তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ইসলামী ছাত্রশিবিরের দখলে।

মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দৈনিক বাংলার বাণী ও আজকের কাগজ পত্রিকাটি ক্যাম্পাসে ছিল নিষিদ্ধ! সেই সঙ্গে ‘বাংলার বাণী’র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মোতাহার হোসেন এবং আমার ক্যাম্পাসে প্রবেশের ওপর স্যাংশন (নিষেধাজ্ঞা) দিয়েছিল ছাত্রশিবির। ক্লাসেও থাকতাম অনুপস্থিত। ফলে আমার দৌঁড় ছিল বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনের ‘মামুর দোকান’ পর্যন্ত। তখন এখনকার মতো মোবাইল বা ইন্টারনেট ছিল না। ল্যান্ডফোনই ছিল একমাত্র ভরসা। ক্যাম্পাসে কোন ঘটনা সংগঠিত হওয়ার খবর পেলে সন্ধ্যায় পুরাতন সামশুন নাহার হলে থাকা ‘মুন্নী’ নামের এক শিক্ষার্থীর মাধ্যমে তার সত্যতা নিশ্চিত হতাম।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সিনিয়র নেতারা বিভিন্ন ঘটনা কাগজে লিখে মামুর দোকানে রেখে যেত, কখনো কখনো কাজীর দেউরি বাংলা হোটেলে দৈনিক সংবাদের তৎকালীন সিনিয়র রিপোর্টার জাফর ওয়াজেদ ভাইয়ের কাছে রেখে যেত। বলে রাখি, তখন আজকের কাগজ পত্রিকার চট্টগ্রামে কোন অফিস ছিল না। বাংলা হোটেলের পাশে খোয়াজা হোটেলের এক কোণায় বসে সাদা কাগজে লিখতাম। সুবিধা ছিল আমার একটা মোটরসাইকেল ছিল। লেখা শেষে তা কোতোয়ালী থানার পাশে মৌসুমী নামের একটি দোকান থেকে ফ্যাক্সের মাধ্যমে ঢাকায় পত্রিকা অফিসে পাঠাতাম। পরদিন তা ছাপা হতো। আর আমাকে ক্যাম্পাসে খুঁজে বেড়াতো শিবিরের ক্যাডাররা।

২৬ বছরের পুরোনো একটি ছবির গল্প!
দৈনিক মুক্তকন্ঠ

নগরে বা ক্যাম্পাসে কোন সংঘর্ষ হলে শিবিরের করা ওই মামলার শেষদিকে আমার নাম থাকতো। ওই সময়ে ১৮টি রাজনৈতিক মামলার মালিক ছিলাম আমি! এই মামলাগুলোই আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে ওঠে এবং সাংবাদিকতা পেশায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের প্রজ্ঞাবান নেতা প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মেয়ের বিয়ে হয়েছিল চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে। হাজার হাজার অতিথি নিমন্ত্রিত ছিলেন। কিন্তু অতিথি নিমন্ত্রণ আইন পুরাপুরি মানা হয়নি। আমার কৌতুহল হয়, তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়ে জানতে পারি ফি জমা দেয়া হয়েছিল ৫০০ জনের। এই রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যে (বর্তমানে আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতার নির্দেশে) আমার আগ্রাবাদ বাসার সামনে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ করে আমাকে ভয় দেখানো হয়। কিন্তু আখতারুজ্জামান চৌধুরী ছিলেন প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ। ঘটনাটি জানার পর তিনি তাদের তিরস্কার করেন।

ডেকোরেশন মালিক সাহাবুদ্দিন আমার আত্মীয়। তাকে দিয়ে খবর পাঠান আমি যেন আখতারুজ্জামান বাবুর সঙ্গে দেখা করি। কিন্তু ভয়ে আমি দেখা করিনি। কয়েক সপ্তাহ পর আমার বাসায় ফোন করে আমার বাবার সঙ্গে কথা বলেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী। এ সময় সত্য তুলে ধরার জন্য তিনি আমার ওই রিপোর্টের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে আমাকে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য অনুরোধ করেন। উল্লেখ্য, আমার বাবা এবং আখতারুজ্জামান চৌধুরী বন্ধু ছিলেন। দুইজনই এখন প্রয়াত। মহান আল্লাহ এই দুইজনকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।

এই অনুসন্ধানী রিপোর্টের মধ্যে দিয়ে আখতারুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে আমার চাচা-ভাতিজা সর্ম্পক তৈরি হয়। যা তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

এদিকে আজকের কাগজ কর্তৃপক্ষ আমাকে প্রমোশন দিয়ে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে পদায়ন করে। ১৯৯৬ সালে সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক কে.জি মোস্তফা সম্পাদিত দেশের প্রথম ২৪ পৃষ্ঠার রঙিন অনলাইন পত্রিকা দৈনিক মুক্তকন্ঠে যোগদান করি। আমার পোস্টিং ছিল চট্টগ্রামে। শুরুতে ব্যুরো চীফ ছিলেন প্রয়াত নুরুল ইসলাম, পরে প্রবীণ সাংবাদিক জাহিদুল করিম কচি।

এবার আসি ১৯৯৮ সালের ২৪ এপ্রিলের ঘটনায়। এই দিনটি ছিল আমার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার স্বীকৃতির দিন। না, আমি সাংবাদিকতার জন্য কোন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাইনি। পেয়েছিলাম একটি রাষ্ট্রদোহী মামলা থেকে জামিন!
আমার সঙ্গে মামলার আসামী ছিলেন বেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও দৈনিক মুক্তকন্ঠের প্রকাশক ইকবাল আহমেদ।

বলে রাখি, পত্রিকায় যা ছাপা হয় তার দায়িত্ব সম্পাদক ও প্রকাশকের। কিন্তু এই মামলায় সম্পাদক কে.জি মোস্তফাকে আসামী করা হয়নি। এতে তিনি বেশ নাখোশ ছিলেন। প্রয়াত এই সম্পাদক আমাকে বলেছিলেন, “এই ধরনের একটি অনুসন্ধানী সত্য একটি সংবাদ প্রকাশের দায়ভার নিয়ে তোমার সঙ্গে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে পারলেই সম্পাদক হিসাবে সার্থক বলে মনে করতাম”।

কী সেই অনুসন্ধানী রিপোর্ট? ১৯৯৮ সালে একই প্রশ্নে সারাদেশে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। কিন্তু প্রথম দিন থেকে ফাঁস হয়ে যায় প্রশ্নপত্র। প্রথমে গুজব মনে হলেও পরীক্ষা শেষে দেখা গেল ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল রয়েছে। দেখা গেল, প্রথমদিন প্রশ্ন যারা পেয়েছেন তারা সীতাকুণ্ড এবং মিরসরাই এলাকার পরীক্ষার্থী। এবার অনুসন্ধানের পালা। চলে গেলাম প্রথমে সীতাকুণ্ড উপজেলা এলাকায়। নজর ফটোকপির দোকান ও পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ওপর। কিছুই পেলাম না।

পরবর্তী গন্তব্য মিরসরাই। সেখানে গিয়ে প্রশ্ন ফাঁসের গুঞ্জন শুনলাম। পরীক্ষার্থী সেজে পিছু নিলাম একজনের। এক সেট প্রশ্নপত্রের জন্য দাবি করলো ১৫ হাজার টাকা, যা আমার এক মাসের বেতনের চেয়ে তিন হাজার টাকা বেশি। পরে রফা হলো ১০ হাজার টাকায়। একসেট প্রশ্ন নিয়ে ফিরে এলাম মুক্তকন্ঠের জামাল খান সড়কস্থ অফিসে। প্রশ্নগুলো নম্বর এলোমেলো করে হাতে লিখে ফ্যাক্সের মাধ্যমে পাঠালাম ঢাকা অফিসে। তখন ডেক্স প্রধান ছিলেন বর্তমান সময় টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আহমেদ জোবায়ের। তিনি আমার ফ্যাক্সটি হাতে পাওয়ার পর নানা প্রশ্নে জর্জরিত করে এটার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন। তারপর তা ছাপানো হলো।

দেখা গেল পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে হুবহু মিল আমার রিপোর্টে উল্লেখ প্রশ্নের সঙ্গে! সারাদেশে তোলপাড়। মুক্তকন্ঠের ফটোকপি বিক্রির ধুম পড়ে যায়। পরপর দুই দিন ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ছাপা হয়। কিন্তু এতে সরকারের টনক নড়েনি। বিষয়টি সংসদে উপস্থাপন করেন বিরোধী দলের এক সদস্য। হৈ-চৈ হয় সংসদে। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী বললেন, প্রকাশিত সংবাদ সত্য নয়, কাগজের ঘাটতি বাড়াতে এই ধরনের সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে।

পরের দিন ২০ এপ্রিল (সোমবার) ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস, ঘরে ঘরে উদ্বেগ’ শিরোনামে একটি সংবাদের সঙ্গে ওই দিনের ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ছাপা হয়। এবার মুক্তকন্ঠের কন্ঠরোধ করার পালা। পরদিন ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো: আবদুল ওয়াহেদ বাদি হয়ে প্রথমে লালবাগ থানায় একটি জিডি করেন। পরে পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন ১৯৮০ সংশোধিত ১৯৯২ ধারায় মামলা দায়ের করা হয় তেজগাঁও থানায়। মামলায় সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট, সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগ আনা হয়, যা জামিন অযোগ্য। মামলা দায়েরের পরপরই তা জানাজানি হয়ে যায়। তৎকালীন মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান টেলিফোনে আমাকে জানান দ্রুত যেন ঢাকায় আসি। সেইদিন রাতেই ঢাকায় যাই। দুইদিন তৎকালীন মুক্তকন্ঠের রিপোর্টার বর্তমানে একাত্তর টেলিভিশনের হেড অব নিউজ শাকিল আহমেদের শেওড়াপাড়ার বাসায় আত্মগোপনে থাকি।

২৩ এপ্রিল ঢাকা মহানগর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মুক্তকন্ঠে’র প্রকাশক ইকবাল আহমেদসহ আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করি। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের পিপি জামিন নামঞ্জুর করার আবেদন জানিয়ে বলেন আসামীরা বিজি প্রেসে ছাপানো প্রশ্নপত্র ‘হুবহু’ পত্রিকায় ছাপিয়ে ‘রাষ্ট্রের গোপনীয়তা’ প্রকাশ করে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপরাধ করেছেন। এতে মুক্তকন্ঠের নিয়োজিত আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল কিছুটা হতচকিত হয়ে পড়েন। জবাবে পাল্টা কী বলবেন তা বুঝে ওঠতে পারছিলেন না।

এই সময় আমি কাঠগড়া থেকে হাত তুলে অতিরিক্ত মূখ্য মহানগর হাকিম হাবিবুর রহমানের দৃষ্টি আর্কষণ করি। তিনি আমাকে কিছু বলতে চাই কীনা জানতে চান। আমি তখন বলি ‘হুবহু’ প্রাপ্ত প্রশ্নের ‘নমুনা’ ছাপানো হয়েছে তা সত্য নয়। এছাড়া রাষ্ট্রের গোপনীয়তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের কাজ; রাষ্ট্র সেই গোপনীয়তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্রের এই ব্যর্থতা তুলে ধরতেই জনস্বার্থে, লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের কথা চিন্তা করে প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত রিপোর্টটিতে কিছু ‘নমুনা’ প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে।

এরপর রিপোর্টটি পড়তে শুরু করেন আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। আদালত ‘নমুনা’ শব্দটি আছে কীনা তা জানতে চান। পরে নিজে রিপোর্টটিতে এক নজর চোখ বুলিয়ে নেন। রিপোর্টে ‘নমুনা প্রশ্নপত্র’ উল্লেখ থাকায় আমাদের জামিন মঞ্জুর করেন মহামান্য আদালত।

পরদিন ২৪ এপ্রিল দৈনিক মুক্তকন্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম সংবাদটি প্রকাশ করার পর সাংবাদিক মহলে আমার ‘কদর’ বেড়ে যায়। প্রশংসা ও অভিনন্দনে সিক্ত হই। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল মুক্তকন্ঠের সম্পাদক কে.জি মোস্তফা স্যার ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সবার সামনে আমাকে সেরা রিপোর্টার’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। আজকের দিনে প্রয়াত সেই সম্পাদককে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তার জান্নাতুল ফেরদৌস কামনা করছি।

এতক্ষণে অনেকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটেছে। এতদীর্ঘ লেখা কে পড়ে! অনেকে হয়ত স্কিপ করে চলে গেছেন ! যারা এখনো আছেন তাদের কৌতুহল আছে, কীভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে তার অনুসন্ধান করেছিলাম কীনা? হ্যাঁ করেছিলাম।

পরবর্তীতে আমি ফিরে যাই মিরসরাইয়ে। যেখান থেকে প্রশ্নপত্রগুলো কিনে ছিলাম। আমার অনুসন্ধান ছিল মাত্র একটি প্রশ্নের ভিত্তিতে। আর তা হচ্ছে বিজি প্রেসে কেউ চাকরি করে কীনা? বারইয়ারহাটের এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারলাম মাস্তান নগর এলাকার একটি ছেলে বিজি প্রেসে চাকরি করে। পেয়ে গেলাম তার তথ্য ও ঠিকানা। এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন, বিজি প্রেসে চাকরি করা ওই ছেলের কোন স্বজন এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে কীনা?

জানতে পারলাম তার ছোটবোন এসএসসি পরীক্ষার্থী। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে গেল। আমার সন্দেহের তীর তার দিকে। এবার চট্টগ্রামের তৎকালীন সিআইডি প্রধানকে বিষয়টি জানালাম। তিনি তাকে আটক করলেন। তার মুখেই বেরিয়ে এলো এত কড়াকড়ি চেকিংয়ের মধ্যে কীভাবে প্রশ্নপত্র বিজি প্রেস থেকে বের করে নিয়ে আসে।

গ্রেপ্তার হওয়া বিজি প্রেসের সেই কর্মচারি জানালো, তার দায়িত্ব ছিল প্রেস থেকে প্রশ্নগুলো গুছিয়ে প্যাকেট করা। তার বোন যেহেতু পরীক্ষার্থী সেকারণে প্রশ্ন বের করার ‘ফন্দি’ বের করে। আর সেই ‘ফন্দি’ হচ্ছে একেক দিন একটি করে নতুন সাদা গেঞ্জি পড়ে প্রেসে যাওয়া। নিজের গায়ের গেঞ্জিটা এক ফাঁকে প্রেসে দিয়ে দিতো। প্রশ্ন ছাপা হওয়ার পর উল্টো করে পড়ে বেরিয়ে আসতো। এভাবে সব প্রশ্ন বিজি প্রেস থেকে এনে তার বোনকে দেয়। তার বোন হাতে লিখে প্রশ্নগুলো দু’এক জন বন্ধু-বান্ধবীকে দেয় সাজেশান হিসাবে। যা পরে ফটোকপির দোকান পর্যন্ত পৌঁছায়। সেখান থেকে প্রশ্ন বিক্রি শুরু হয়। যা পরবর্তীতে মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে। যার একসেট প্রশ্ন আমিও কিনে নিয়েছিলাম বেতনের টাকায়।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুরো ঘটনা পরে ‘দৈনিক মুক্তকন্ঠে’ ধারাবাহিকভাবে ছাপানো হয়। সিআইডি প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত পুরো চক্রটিকে গ্রেপ্তার করে। আর আমি এবং দৈনিক মুক্তকন্ঠে’র প্রকাশক ইকবাল আহমেদ মামলা থেকে অব্যাহতি পাই।

এতক্ষণ নিজের ঢাক নিজে পেটালাম, কারণ অন্যে পেটালে হয় জোরে পিটিয়ে ফাটিয়ে ফেলতে পারে; নতুবা এত আস্তে পিটাবে যে তা কেউ শুনতেই পাবে না!

সুনীল গঙ্গোপধ্যায়ের কবিতার মতো আমারও তেত্রিশ বছর কাটলো সাংবাদিকতায়। এই সময়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মানচিত্র অনেক বড়ো হয়েছে। সেই মানচিত্রে আমি একটি ‘বিন্দু’ মাত্র ! আমি হতে পারিনি বিখ্যাত কোন সাংবাদিক। যদিও আমার সম-সাময়িক সাংবাদিকরা এখন অনেক আলোয় আলোকিত। এতে আমার কোন ক্ষোভ, অভিমান নেই।

আমার গর্ব, আমার অহংকার ‘সততা’। সাদাকে ‘সাদা’ কালোকে ‘কালো’ বলার সাহস নিয়ে এখনও দেশ-জাতি ও মানুষের কল্যাণে অবিরাম লিখে যাচ্ছি। আমি অনুজ সাংবাদিক এবং উত্তারাধিকারিদের কাছে রেখে যেতে চাই সততা, সত্যনিষ্ঠার মাধ্যমে পেশাগতভাবে অসহায় নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস। শেষ কথা, পাওয়া না পাওয়ার দোলাচলে ব্যক্তিগত জীবনে আমি একজন সুখী মানুষ।

বিএনএনিউজ/ বিএম/এইচমুন্নী /হাসনাহেনা

Loading


শিরোনাম বিএনএ