নাদিয়াকে ঘিরে বাবা-মা’র স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল!

বিএনএ: মেয়ে ফার্মাসিস্ট হবে! এই স্বপ্ন নিয়ে মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে মেয়েকে ভর্তি করান নাদিয়া সুলতানার (১৯) বাবা-মা। বড় মেয়েটা মেধাবী হওয়ায় তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল পরিবারের। সেই স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল অমানবিক এই শহরে। নিষ্ঠুর এই শহরের কনক্রিটের রাস্তায় বাসের চাকায় পিষ্ট হতে হলো তাকে।

রোববার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে যান নাদিয়ার মা-বাবা। তাঁদের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায়। তিন বোনের মধ্যে সবার বড় নাদিয়া। বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন একটি পোশাক কারখানায় সহকারী মহাব্যবস্থাপক পদে কর্মরত।

গার্মেন্টে চাকরি করে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে মেয়ে নাদিয়া আক্তারকে নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি করান মো. জাহাঙ্গীর। বড় মেয়ে নাদিয়াকে নিয়ে ছিল বড় স্বপ্ন। ক্লাস শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে ভিক্টর বাসের চাপায় প্রাণ গেল নাদিয়ার।

মোটরসাইকেল চালক নাদিয়ার বন্ধু মেহেদি জানান, রোববার ক্লাস না থাকায় মোটরসাইকেলে করে বই কিনতে উত্তরার বাসা থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যাচ্ছিলেন তারা। যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে তাঁদের মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয় ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস। এতে রাস্তার বাম পাশে ছিটকে পড়েন তিনি আর নাদিয়া ছিটকে পড়েন ডানপাশে। বাসটি তখন না থামিয়ে চালক নাদিয়ার মাথার উপর দিয়ে চালিয়ে দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন নাদিয়া। বাম পাশে পড়ায় মেহেদির আঘাত গুরুতর নয় বলে জানান তিনি।

হাসপাতালের মর্গের সামনে জাহাঙ্গীর হোসেন তখন নির্বাক। হাউমাউ করে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন তার সব শেষ! ওরা তার সব স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে! বলেন, পরিবার নিয়ে খেয়ে না-খেয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি করিয়েছিলেন তিনি।

কথা বলতে বলতে চেয়ার থেকে পড়ে যান জাহাঙ্গীর হোসেন। কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, ‘আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব!’ পরক্ষণেই উঠে মেয়ের লাশ দেখতে মর্গের দিকে দৌড়ে যেতে শুরু করেন।

মা পারভিন আক্তার মেয়ের জন্য আহাজারি করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাঁকে সুস্থ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন অন্যরা। এ অবস্থায় সেখানে উপস্থিত অন্যদেরও এই মা-বাবার সন্তান হারানোর শোক ছুঁয়ে যায়। তাঁদের অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

এদিকে বাসচাপায় নাদিয়ার মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে বিকেলে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কাওলা এলাকার ফুটওভারব্রিজের নিচে জড়ো হন নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের তাঁর সহপাঠীসহ কয়েক শ শিক্ষার্থী। তাঁরা সড়ক অবরোধ করে চালককে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

নাদিয়ার সহপাঠীরা জানান, মাত্র দুই দিন তাদের ক্লাস হয়েছে। এর মধ্যে এক বন্ধুকে হারাতে হলো তাদের। দায়ী চালককে দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী বলেন, রাজধানীতে প্রতিদিনই সড়কে প্রাণ ঝরছে, মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীরা মারা যাচ্ছেন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন হয়। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না।

নাদিয়ার সহপাঠী ও অন্য শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে বিমানবন্দর সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঘণ্টাখানেক পর সন্ধ্যার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়ক ছেড়ে চলে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিজুল হক জানান, শিক্ষার্থীরা দাবি অনুযায়ী চালককে গ্রেপ্তারের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে চালককে গ্রেপ্তার করা হবে বলে শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দিলে সড়ক ছেড়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। পুলিশ জানায়, বাসটি জব্দ করা গেলেও পালিয়ে যায় বাসের চালক ও তাঁর সহযোগী।

এই ঘটনায় নাদিয়ার বাবা সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেছেন বলে জানান ভাটারা থানার ওসি এ বি এম আছাদুজ্জামান।

বিএনএনিউজ/এ আর