28 C
আবহাওয়া
৪:৩০ পূর্বাহ্ণ - এপ্রিল ২৫, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » ৪৬ বছর পর ‘জিন্দা অলি’ কে কবর দিয়েছে চন্দনাইশবাসী!

৪৬ বছর পর ‘জিন্দা অলি’ কে কবর দিয়েছে চন্দনাইশবাসী!


বিএনএ, ডেস্ক : ড. অলি আহমেদ। একজন বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজনীতিক। এক সময় তিনি সবার শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় তিনি এখন সবার কাছে ঘৃনার পাত্র। তার মুখের এমন অশ্লীল ভাষা ও কটূক্তি দম্ভোক্তি এখন সারাদেশের মানুষের মুখে মুখে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ড. অলি আহমেদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি হঠাৎ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট করে। তার সন্তান ওমর ফারুক চট্টগ্রাম -১৪ (চন্দনাইশ) আসনে বিএনপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন।

এর মাধ্যমে মানুষের কাছে জিন্দা ওলিখ্যাত অলি আহমেদের চন্দনাইশে ৪৬ বছরের সাম্রাজের পতন হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘জিন্দা অলি’কে করব দিয়েছে চন্দনাইশবাসী! সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন এই পর্বে জেনে নিই- রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সচিব কর্নেল অলি আহমেদ কীভাবে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন? কেনইবা বিএনপি ছেড়ে দলটির কট্টর সমালোচক হয়ে উঠলেন।

YouTube player

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমেদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন সময়ে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে, সেই খবর পাওয়ার পর অলি আহমেদই প্রথম বাঙালি সামরিক অফিসার হিসেবে চট্টগ্রামে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ২৭ মার্চ তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের অন্যতম প্রধান সাক্ষী ও সহযোগী ছিলেন। ক্যাপ্টেন অলি ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে সম্মুখ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তিনি কালুরঘাট, মিরসরাই, মস্তাননগর এবং কুমিরাসহ বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। জুলাই ১৯৭১-এ তিনি মুক্তিবাহিনীর নিয়মিত বিগ্রেড ‘জেড-ফোর্স’-এর প্রথম বিগ্রেড মেজর হিসেবে নিযুক্ত হন।

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করে। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধে এই খেতাব পাওয়া প্রথম অফিসার ।

দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে তিনি মেজর পদে পদোন্নতি পান ।১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন সপরিবারে নিহত হন, তখন
সৈয়দপুর সেনানিবাসে ২৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন অলি আহমেদ।
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পরপরই ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি পান এবং ২৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার নিযুক্ত হন। ওই বছর নভেম্বর মাসে তাঁকে সৈয়দপুর থেকে বদলি করে ঢাকা সেনানিবাসের সেনা সদর দপ্তরে জিএসও-১ (অপারেশনস) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই পদটি ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর, যেখান থেকে সেনাবাহিনীর অপারেশনাল বিষয়গুলো তদারকি করতেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের সময় কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ (তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল) সরাসরি রণাঙ্গনে বা রাজপথে না থাকলেও, ক্ষমতার কেন্দ্রে জিয়াউর রহমানের মুক্তি ও পরবর্তী স্থিতিশীলতা রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

৭ নভেম্বর বিপ্লবের মাধ্যমে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান যখন সেনাসদরে আসেন, অলি আহমেদ তখন তাঁর অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হন। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেন, তখন অলি আহমেদ তাঁর ব্যক্তিগত সচিব নিযুক্ত হন । তিনি মূলত পর্দার আড়ালে থেকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং সামরিক প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে যে দফায় দফায় ১৯টি বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল, সেগুলো নিয়ন্ত্রণে অলি আহমেদ জিয়াউর রহমানের প্রধান কৌশলী হিসেবে কাজ করেন।

১৯৭৮ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি গঠনে সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত তৎকালীন লে. কর্নেল অলি আহমেদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি কর্নেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

প্রসঙ্গত. ১৯৭৯ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে জাতীয় সংসদের ১৯১ নম্বর আসন বর্তমানে ১৪, তৎকালীন চট্টগ্রাম-১৩ (চন্দনাইশ) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির মাহবুব করিম চৌধুরী। তার প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন আওয়ামী লীগের মোস্তাফিজুর রহমান। ১৯৮০ সালে সংসদ সদস্য মাহবুব করিম মৃত্যুবরণ করলে আসনটি শুন্য হয়। কর্নেল অলি আহমেদ ওই বছর ১০ই জানুয়ারি সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে অবসর গ্রহণ করেন। ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তৎকালীন সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি)তে যোগ দেন। মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে প্রথমবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন আওয়ামী লীগের হারুনুর রশীদ।

১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অলি আহমেদ যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্বকাল দীর্ঘ হয়নি, কারণ মাত্র এক মাস পরেই লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন।

অলি আহমেদ ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জাফর আহমেদ চৌধুরীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হন। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করলে যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা লাভ করেন। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন।

আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের বর্জন করা ১৯৯৬ সালের ৬ষ্ট সংসদ নির্বাচনে অলি আহমেদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১১ দিন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ হওয়ার পর সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। ওই সময় গঠিত মন্ত্রী সভায় তিনি কৃষি, খাদ্য এবং পানি সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

১৯৯৬সালের ১২ই জুন অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে অলি আহমেদ বিএনপির টিকেটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তাকে বিরোধী দলের আসনে বসতে হয়। এ সময় তিনি উচ্চ শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটি (Oxford Brookes University) থেকে ২০০৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তা। একজন সক্রিয় জাতীয় নেতা হিসেবে ব্যস্ত সময় পার করার মাঝেও শিক্ষার প্রতি অলি আহমেদের এই গভীর আগ্রহ এবং উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিকদের মাঝে একটি বিরল দৃষ্টান্ত ।

২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জোট হয়। ওই নির্বাচনে চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া দুটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায় ড. অলি আহমেদ। কিন্তু ৪দলীয় জোট থেকে চন্দনাইশ আসনে তাকে মনোনয়ন দেয়। কিন্তু তিনি সাতকানিয়া সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী। এই অবস্থায় জোট থেকে সাতকানিয়া আসনটি ফ্রি আসন ঘোষণা করে। বিএনপি থেকে অলি আহমেদ ধানের শীষ প্রতীকে, জামায়াতে ইসলামী থেকে দাড়িপাল্লা প্রতীকে শাহজাহান চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা অলি আহমেদ চন্দনাইশ আসনে আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার আবছার উদ্দিনকে ১২ হাজার ৩ শত ১৬ ভোটে পরাজিত করেন। কিন্তু সাতকানিয়া আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর কাছে ৪১ হাজার ৫ শত ৮৯ ভোটে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করেন।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোটসরকার গঠন করলে জামায়াতে ইসলামীর আপত্তির কারণে মন্ত্রী সভায় স্থান পায়নি তৎকালীন বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী এই নেতা। বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজেকে উপেক্ষিত মনে করছিলেন ড. অলি। তাঁর মতে, ২০০১ সালের পর বিএনপি ‘অযোগ্য ও অশিক্ষিত’ নেতৃত্বের কবলে পড়ে যায়।

বিএনপির ক্ষমতা ছাড়ার দুইদিন আগে ড. অলি সরাসরি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ‘হাওয়া ভবন’ কেন্দ্রিক সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা এবং এর মাধ্যমে হওয়া অনিয়ম ও দুর্নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেন যে, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রশ্রয়ে চলা ‘অবাধ দুর্নীতি’র প্রতিবাদেই তিনি দল ছাড়ছেন’।

ড. অলি ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি ত্যাগ করেন। বিএনপি থেকে বেরিয়ে অলি আহমেদ এবং আরও ২৪ জন তৎকালীন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মিলে সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারার সঙ্গে একীভূত হয়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এলডিপি গঠন করেছিলেন। তবে এক বছরের মধ্যেই মতভেদের কারণে বদরুদ্দোজা চৌধুরী এলডিপি ছেড়ে পুনরায় বিকল্প ধারা পুনরুজ্জীবিত করেন।

বিএনএ/ওজি

Loading


শিরোনাম বিএনএ