বিএনএ, ঢাকা : বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রথম সভাপতি ছিলেন এ টি এম আজহারুল ইসলাম। পরবর্তীতে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১২ সালে ২২ শে আগস্ট এটিএম আজাহারুল ইসলামকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে।
কিন্তু আপিল নিম্পত্তি না হওয়ায় তিনি কারাগারে আটক ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হওয়ার পর ২০২৫ সালের ২৭ মে উচ্চ আদালতের আপিলের খালাস পান জামায়াতে ইসলামীর নেতা এটিএম আজাহারুল ইসলাম। রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণকারি ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে আসা জামায়াত ইসলামীর এই নেতা ৪র্থবারের মতো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-২ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
এর আগে ১৯৯৬ সালের পঞ্চম ২০০১ সালের অষ্টম ও ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে অংশ নেন। কিন্তু কোন নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেননি। এবার তার প্রতিদ্বন্দ্বি জাতীয় পার্টি থেকে ২০০১ সালে নির্বাচিত এমপি মোহাম্মদ আলী সরকার। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ওই বছর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে তিনি হেরে যান।
কেমন হবে তাদের ভোটের লড়াই? সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন জেনে নেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল।
রংপুর ২ সংসদীয় আসনটি রংপুর জেলার তারাগঞ্জ এবং বদরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত। এটি জাতীয় সংসদের ২০ নাম্বার আসন।
১৯৯১ সালের ২৭ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে রংপুর-২ আসনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯ শত ৩৭ জন। ভোট প্রদান করেন ১লাখ ১০ হাজার ৬ শত ৪৭ জন। নির্বাচনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ বিজয়ী হন। লাঙ্গল প্রতীকে তিনি পান ৫০ হাজার ২ শত ২১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের আনিছুল হক চৌধুরী। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৪৫ হাজার ২ শত ৬ ভোট।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ট জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি, ফ্রিডম পার্টি এবং কিছু নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল, অখ্যাত ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগসহ সব বিরোধী দল শুধু নির্বাচন বর্জন করে ক্ষান্ত হয়নি, প্রতিরোধও করে। ফলে ভোটগ্রহণ পন্ড হয়ে যায়। ১১ দিন মেয়াদের ৬ষ্ট সংসদে রংপুর-২ আসনে কাউকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়নি!
১৯৯৬ সালের ১২ই জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৮১ হাজার ৬ শত ৫৫ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৩ শত ৩৩ জন। নির্বাচনে জাতীয় পার্টির এইচ এম এরশাদ বিজয়ী হন। লাঙ্গল প্রতীকে তিনি পান ৬৬ হাজার ৯ শত ২৯ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের আনিসুল হক চৌধুরী।নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৫৫ হাজার ৮ শত ভোট।
২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৩০ হাজার ৫শত ৭০ জন । ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৯ শত ৬৬ জন। নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আলী সরকার বিজয়ী হন। লাঙ্গল প্রতীকে তিনি পান ৯১ হাজার ৯ শত ২১ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের আনিসুল হক চৌধুরী। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৭৮ হাজার ১ শত ৬৩ ভোট।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৫০ হাজার ৮শত ৩৯ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ২১ হাজার ৬ শত ৬৯ জন। নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মন্ডল বিজয়ী হন। লাঙ্গল প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৬৬ হাজার ২ শত ৭১ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াত ইসলামী এটিএম আজারুল ইসলাম। দাড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পান ৩৬ হাজার ৫ শত ৮৬ ভোট।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্বিতায় আওয়ামী লীগের আহসানুল হক চৌধুরী বিজয়ী হন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি।
২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের আহসানুল হক চৌধুরী, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির আসাদুজ্জামান চৌধুরী, কুলা প্রতীকে বিকল্পধারা বাংলাদেশের হারুন অর রশিদ, মশাল প্রতীকে জাসদের কুমারেশ চন্দ্র রায়, আম প্রতীকে ন্যাশনাল পিপলস্ পার্টির ওয়াসিম আহমেদ, গোলাপফুল প্রতীকে আশরাফ উজ জামান, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আশরাফ আলী, টেলিভিশন প্রতীকে বিএনএফ এর জিল্লুর রহমান, সিংহ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী আনিছুল ইসলাম মন্ডল প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।
কিন্তু নির্বাচনের আগের রাতে প্রশাসনের সহযোগীতায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী নৌকা প্রতীকে সিল মেরে ব্যালট বক্স ভর্তি করে রাখে। কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। আওয়ামী লীগের আহসানুল হক চৌধুরীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
২০২৪ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলীয় জোটসহ ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করলেও বিএনপি, জামায়াত ইসলামীসহ তাদের সমমনা দলগুলো অংশগ্রহণ করেনি। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আহসানুল হক চৌধুরীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনএ নিউজ টুয়েন্টি ফোর এর গবেষণা টিম দৈবচয়ন পদ্ধতিতে সারাদেশে জরিপ চালায়। জরিপে অংশগ্রহণকারি বেশীরভাগ ভোটার ১৯৯১ সালের পঞ্চম, ১৯৯৬ সালের সপ্তম, ২০০১ সালের অষ্টম ও ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।
তারই ভিত্তিতে বিএনএ নিউজ টুয়েন্টি ফোর রংপুর-২ আসনের ৪টি নির্বাচনের প্রদত্ত ভোটকে মানদন্ড ধরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক শক্তি বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৫৭.৯৩% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪০.৮৬%, বিএনপি ২.০৯%, জাতীয় পার্টি ৪৫.৩৯ %, জামায়াত ইসলামী ৬.৯৪%, স্বতন্ত্র অন্যান্য দল ৩.৯১% ভোট পায় ।
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৭.২৫% ভোটার।প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৯.৭৬%, বিএনপি ২.৮৭% জাতীয় পার্টি ৪৭.৬৯% জামায়াত ইসলামী ৫.৯০%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দল ৩.৭৮ % ভোট পায়
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৮১.৯৭ % ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪১.৩৬%, ৪দলীয় জোট ৯.৯৪%, জাতীয় পার্টি ৪৮.৭০% পায়।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৮৮.৩৭ %। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মহাজোট ৭৫.০১%, ৪দলীয় জোট ১৬.৫০%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দল ৮.৪৯% ভোট পায়।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রংপুর-২ (তারাগঞ্জ এবং বদরগঞ্জ) আসনটি এক সময় জাতীয় পার্টির দুর্গ ছিল। ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে এই আসনটি দখলে নেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে রংপুর-২ আসনে পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম সংসদে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা বিজয়ী হন। নবম সংসদে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি মাঠে নেই।আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতীয় পার্টির কার্যক্রম স্থগিত না হলেও মব সৃষ্টি করে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচী পালনে বাঁধা দেয়া হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারাভিযানে আছে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী এটিএম আজাহারুল ইসলাম ও বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সরকার। এবার তাদের দুইজনের মধ্যে সরাসরি লড়াই হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামীর প্রার্থীরা ১৬.৫০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। ২০০৮ সালে ৪ দলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াত ইসলামী এটিএম আজারুল ইসলাম প্রদত্ত ভোটের ১৬.৫০ শতাংশ ভোট পান।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে রংপুর-২ সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের ভোটারা জয় পরাজয়ে বড় ফ্যাক্টর। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টি সখ্যতা রয়েছে। জাতীয় পার্টি যদি নির্বাচনে প্রার্থী দিলে বিএনপি, জামায়াত ইসলামী ও জাতীয় পার্টির মধ্যে ত্রিমূখী লড়াই হবে। সেই ক্ষেত্রে জামায়াত ইসলামীর এটিএম আজাহারুল ইসলাম, বিএনপির মোহাম্মদ আলী উভয়ে হেরে গেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না বলে মনে করেন বিএনএ নিউজ টুয়েন্টি ফোরের দৈবচয়ন জরিপে অংশগ্রহণকারি ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনএনিউজ/সৈয়দ সাকিব/এইচ.এম।
![]()
