26 C
আবহাওয়া
৬:৪০ অপরাহ্ণ - ডিসেম্বর ৬, ২০২৫
Bnanews24.com
Home » বিপ্লবীরা ক্ষমতায় গেলে বিপ্লব ব্যর্থ হয়!

বিপ্লবীরা ক্ষমতায় গেলে বিপ্লব ব্যর্থ হয়!


বিএনএ, ঢাকা: বিপ্লবীরা ক্ষমতায় গেলে বিপ্লব ব্যর্থ হয়! এই কথাটি বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নতুন সামনে এসেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, যে দল বা গোষ্ঠী বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হয়, তারা ক্ষমতায় পৌঁছানোর পর সেই বিপ্লবের মৌলিক আদর্শ রক্ষা করতে পারে না। নানা তাত্ত্বিক অবস্থান, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং সমসাময়িক বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ মিলিয়ে আবারও এই ধারণা আলোচিত হচ্ছে যে, বাংলাদেশে বিপ্লবীরা ব্যর্থ হতে চলেছে।

YouTube player

এবার আসি সেই বিশ্লেষণে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি স্থায়ী পর্যবেক্ষণ হলো ক্ষমতার প্রকৃতি পরিবর্তনশীল। বিপ্লবের নেতৃত্ব সাধারণত অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনসমর্থন গড়ে তোলে। কিন্তু ক্ষমতা দখলের পর রাষ্ট্রের যন্ত্র পরিচালনা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং স্বার্থগোষ্ঠীর চাপ বিপ্লবী নেতৃত্বকে নিজের মূল নীতির বাইরে ঠেলে দেয়। এর ফলে আদর্শের জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হয় বাস্তবসম্মত প্রয়োজন, যা বিপ্লবের মূল চরিত্রকে বদলে ফেলে।

ক্রেন ব্রিনটনের বিপ্লব তত্ত্বে বলা হয়েছে, বিপ্লব সাধারণত উচ্ছ্বাস দিয়ে শুরু হলেও শেষপর্যন্ত আসে সমন্বয় ও স্থিতির সময়। সেই স্থিতি পর্বে বিপ্লবীরা প্রায়ই তাদের পূর্ববর্তী শাসকদের মতো আচরণ করতে শুরু করে।

অন্যদিকে, থেডা স্ককপলের মতে, সামাজিক বিপ্লবের শেষ লক্ষ্য থাকে রাষ্ট্র পুনর্গঠন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব হাতে নেয়ার পর বিপ্লবী দলকে অনিবার্যভাবে প্রশাসনিক কাঠামো ও পুরনো অভ্যাসের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হয়। সেখানেই দেখা দেয় বিপ্লবের ব্যর্থতা।

সোভিয়েত বিপ্লবের অভিজ্ঞতা থেকে বহু তাত্ত্বিক দেখিয়েছেন, ক্ষমতায় পৌঁছানো মাত্রই সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ধীরে ধীরে প্রশাসনিক কর্তৃত্ববাদে রূপ নেয়। ট্রটস্কি এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “Revolution is betrayed when bureaucracy replaces the masses.” তাঁর মতে, জনগণ যখন পিছনে পড়ে যায়, আর সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষমতাকেন্দ্র, তখনই বিপ্লব তার প্রাণশক্তি হারায়।

বিভিন্ন সময়ের ইতিহাসে দেখা যায় যে, বিপ্লবীরা ক্ষমতায় এসে নিজেদের ঘোষিত আদর্শ ধরে রাখতে পারেনি।
এবার আসা যাক সেই আলোচনায়। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব পর্যালোচনায় দেখা যায়, জনগণের স্বাধীনতা, সাম্য আর ভ্রাতৃত্বের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হলেও রোবসপিয়ারের নেতৃত্বে ‘Reign of Terror’ দেশকে নতুন এক কর্তৃত্ববাদের দিকে ঠেলে দেয়। বিপ্লবীরা পুরনো রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়লেও নিজেদের হাতে ক্ষমতা পেয়ে একই ধরনের দমননীতি প্রয়োগ করে।
১৯১৭ সালের সোভিয়েত বিপ্লবে দেখা যায়, শ্রমজীবীদের রাষ্ট্র গড়ার ঘোষণা দিয়েছিল বলশেভিকরা। পরে একদলীয় শাসন, গোপন পুলিশ এবং দমন-পীড়ন সেই আদর্শকে ক্ষয় করে দেয়। শ্রমিকের ক্ষমতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় পার্টি বিদ্যমান আমলাতন্ত্র।

১৯৭৯ সালের ইরানে বিপ্লব পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শাহ শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান হলেও ক্ষমতায় আসার পর বিপ্লবী নেতৃত্ব ধর্মতান্ত্রিক ও কঠোর রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। যে রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি বিপ্লবকে উজ্জীবিত করেছিল, তার অনেকটাই হারিয়ে যায়।

১৯৫৯ সালের কিউবায় বিপ্লবে দেখা যায়, ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবী সরকার প্রথমে গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও দ্রুতই রাষ্ট্রের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বিপ্লবের মুক্তির ভাষ্য রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে এসে নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করে।

এই অভিজ্ঞতাগুলো দেখায় যে, বিপ্লবীরা ক্ষমতায় গেলে প্রাথমিক লক্ষ্য ও নীতির জায়গায় ক্ষমতা রক্ষা, প্রশাসনিক স্থিতি এবং দলগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়।

বাংলাদেশে জুলাই মাসের অভ্যুত্থান এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত মাস মোবিলাইজেশনের ফল। দীর্ঘদিনের অভিযোগ, রাজনৈতিক দমননীতি এবং প্রশাসনিক বৈষম্য জনগণকে আন্দোলনে ঠেলে দেয়। সেই আন্দোলনের সময় নানা গোষ্ঠী একত্রে কাজ করেছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের পরই রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতে নতুন অস্থিরতা জন্ম নেয়।

ড. ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সংকট নিরসনে কিছু উদ্যোগ নেয়। কিন্তু একই সঙ্গে দেখা যায় ক্ষমতার পাটাতনে স্থানে-স্থানে সংঘর্ষমুখী রাজনৈতিক আচরণ। একটি জনপ্রিয় গণআন্দোলনের পর যে স্বচ্ছতা ও ভারসাম্যের প্রত্যাশা তৈরি ছিল, তা অনেকখানি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিপ্লবী উত্তেজনা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান হয়।

আন্দোলনের মুখ হিসেবে পরিচিত তিন ছাত্রনেতা পরবর্তীকালে মন্ত্রী হওয়ার ঘটনা বিপ্লবের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনাকে আরও তীব্র করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব সাধারণত নীতিভিত্তিক থাকে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে গেলে স্বাভাবিকভাবেই সেই নীতি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়।

প্রথমে নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়াকে উপদেষ্টা পরিষদে স্থান দেন ড. ইউনূস। এরপর মন্ত্রী পদমর্যাদায় ক্ষমতায় আনেন আরেক বিপ্লবী ছাত্রনেতা মাহফুজ আলমকে। যদিও শুরুতে এই ছাত্র উপদেষ্টাদের প্রতি যে প্রত্যাশা ছিল সাধারণ মানুষের, তা পূরণে ব্যর্থ হয় এদের সবাই।

যদিও রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায়, উপদেষ্টা পদ ছাড়েন নাহিদ। আসিফ ও মাহফুজ এখনো উপদেষ্টা রয়ে গেছেন। একের পর এক বিতর্কেও জড়িয়েছেন এই দুই উপদেষ্টা। কেউ যাচ্ছেন নীলা মার্কেট থেকে হোটেল ওয়েস্টিনে হাস খেতে; আবার ফেসবুকে বেফাঁস মন্তব্য করেও জনগণের গ্রহণযোগ্যতা হাড়াচ্ছেন কেউ কেউ।

দুই ছাত্র উপদেষ্টার এহেন কর্মকাণ্ডে বিপ্লবের স্পিরিট নষ্ট হয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বরং তারা যদি ক্ষমতার বাইরে থেকে একটি প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করতো, তবে সেটিই হতো বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। বিশ্লেষকদের মতে, বিপ্লবের ফসল পেতে ধাপে ধাপে আগাতে হয়।

নির্দলীয় গণআন্দোলনের নেতৃত্ব যখন হঠাৎ করেই রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে প্রবেশ করে, তখন তাদের সামনে থাকে প্রশাসনিক কাঠামো, স্বার্থগোষ্ঠী এবং ক্ষমতা রক্ষার প্রয়োজন। ফলে আন্দোলনের সময়কার নৈতিক ভাষা এবং ক্ষমতার আচরণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্বই অনেক সময় বিপ্লবের ব্যর্থতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়।

বাংলাদেশে পরিবর্তনের মুহূর্তে জনগণের প্রত্যাশা ছিল সুশাসন, জবাবদিহি এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর দেশ আবার রাজনৈতিক বিভাজন, ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা এবং প্রশাসনিক টানাপোড়েনে ফিরে যায়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী, বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রগুলোতে ক্ষমতার কেন্দ্র স্থিতিশীল হতে সময় লাগে। সেই সময়ের মধ্যে আদর্শের জায়গায় বাস্তব ক্ষমতা পরিচালনা মুখ্য হয়ে ওঠে।

সমালোচকেরা মনে করেন, জুলাইয়ের পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের নৈতিক অবস্থানকে রূপান্তরিত করে নতুন রাজনৈতিক সত্তা নিজস্ব ক্ষমতা সুসংহত করার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। যে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি আন্দোলনকে উজ্জীবিত করেছিল, তা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে গেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব, ইতিহাসের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা একই দিকে ইঙ্গিত করে। বিপ্লব বা অভ্যুত্থান যতই উচ্চ নৈতিকতা বা পরিবর্তনের ভাষা নিয়ে শুরু হোক, ক্ষমতাকেন্দ্রের ভেতর প্রবেশ করা মাত্রই নেতৃত্বকে সামলাতে হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপ, দলগত স্বার্থ এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে এই চাপই বিপ্লবের আদর্শকে ক্ষয় করে ফেলে। বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিও দেখায়, বিপ্লবীদের ক্ষমতায় ওঠা মানেই বিপ্লবের সফলতা নয়। বরং অনেক সময় সেটিই পরিণত হয় বিপ্লবের উদ্দেশ্য বিচ্যুতির মূল সূচক।

সৈয়দ সাকিব

Loading


শিরোনাম বিএনএ