Bnanews24.com
Home » মুনিরীয়া’র ভণ্ডামি-১৬(বিচ্ছু  কাহিনী)
বিশেষ সংবাদ

মুনিরীয়া’র ভণ্ডামি-১৬(বিচ্ছু  কাহিনী)

।।ইয়াসীন হীরা।।

২০১২ সালের ২৮ জানুয়ারি। ঢাকার বায়তুল মোকারম জাতীয় মসজিদ এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশে’র এশায়াত সম্মেলন। জাঁকজমকপূর্ণ এ সম্মেলন উপলক্ষে একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়। যা বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়। ক্রোড়পত্রে কথিত গাউছুল আজম (শায়খ তফজ্জল আহমদ) এর আধ্যাত্মিক ক্ষমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বেশ কয়েকটি ভণ্ডামিমূলক বানোয়াট কারামতের কথা উল্লেখ করা হয়। তার অন্যতম হলো এক প্রবাসীর শিশুর মাথা থেকে বিচ্ছু (বিষাক্ত কিট) বের হওয়ার অলৌকিক কারামত। এর মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে রাউজানের কাগতিয়ার দরবারের পীরের মুরিদ হলে বিভিন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়!

মুনিরীয়া যুব তবলীগের কর্ণধার মুনির উল্লাহ আহমদী ও অধ্যাপক ফোরকান মিয়ার ‘ওপেন সিক্রেট’ ভণ্ডামির গুরুত্ব বাড়াতে গিয়ে ক্রোড়পত্রে বলা হয়,“একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই সর্বশক্তিমান। আল্লাহ তায়ালা তার বিশেষ বিশেষ বান্দাকে বিশেষ ক্ষমতা দান করেন। যেমন- হযরাতে আম্বিয়া কেরামের ক্ষেত্রে মো’জেযা আর আউলিয়াল্লাহর ক্ষেত্রে কারামত। আকাইদবিদগণ একমত পোষণ করেন আল্লাহর অলীগণের কারামত হক্ব, সত্য ও বাস্তব”।

ক্রোড়পত্রে কথিত গাউছুল আজম (তফজ্জল আহমদ) বানোয়াটকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে মুনিরীয়া যুবতবলীগ কমিটি বাংলাদেশ ও মুনিরীয়া পীরের এক মুরিদের বরাতে কথিত “বিচ্ছু কারামত” বর্ণনা করা হয়। যা হুবহু তুলে ধরা হলো।

“মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন, পিতা-মরহুম নুরুল আলম মাষ্টার, অলিমিয়া হাট, আধার মানিক, রাউজান, চট্টগ্রাম। বর্তমানে ওমানের মাস্কেট-এর হামরিবা প্রবাসী। আমি ১৯৯২ সাল থেকে মাস্কেট প্রবাসী এবং ২০০৪ সাল থেকে সেখানে সপরিবারে বসবাস করি। বিগত ১৩ আগস্ট ২০০৮ইং তারিখে আমার একটি কন্যা সন্তান ভূমিষ্ট হয়। মেয়েটি যখন একটু বড় হয় তখন বেলুন দিয়েছিলাম খেলতে। তখন বুঝতে পারলাম যে, মেয়েটি বেলুন দেখতে পাচ্ছে না। শুধু একদিকে তাকিয়ে আছে।

আমি সময়ক্ষেপণ না করে ওমানের বদর আছ-ছামা ক্লিনিকে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে বিষয়টি খুলে বললে তিনি কয়েকটি পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট দেখার পর তিনি বললেন, মেয়েটি জন্মান্ধ, জীবনে আর ভাল হবে না। এতে আমি, আমার মা, আমার স্ত্রী এবং আত্মীয় স্বজন সকলে হতাশা ও চিন্তিত হয়ে পড়ি।

আমার মা ও আমার স্ত্রী মারাত্মকভাবে ব্যথিত হন। আর আমার স্ত্রী আমার গাউছুল আজমের ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন ‘ফজলে আহমদী’তে তাঁর বিভিন্ন কারামত পড়তেন আর কান্নাকাটি করে বলতেন- আমার গাউছুল আজমের এতই কারামত! তিনি কি আমার মেয়ের জন্য দোয়া করতে পারেন না? আমার মেয়ের চক্ষুকে ভাল করে দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ কি গাউছিয়্যতের একটি কারামত প্রকাশ করতে পারেন না? গাউছুল আজমের উছিলায় আল্লাহ কি আমার মেয়ের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেবে না?’

একদিন আমার স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্নে গাউছুল আজমকে দেখল। তিনি ঘুম থেকে উঠে আমাকে বললেন যে, সে স্বপ্নে দেখতে পাচ্ছে, আমার বাসায় গাউছুল আজম তশরীফ নিয়েছেন আর আমার স্ত্রীকে বলছেন, তোমার মেয়ের মাথায় দুটি বিচ্ছু আছে। আমি দোয়া করছি আল্লাহ যেন বিচ্ছু দুটি বের করে দেন”।

পরবর্তীতে লেখা হয়, “আমি দেখতে পাচ্ছি, আমার মেয়ের মাথা থেকে একটি বিচ্ছু দ্রুত গতিতে অন্যটি ধীরে ধীরে বের হচ্ছে। এ কথা শুনে আমি কাল বিলম্ব না করে আবার ডাক্তারের কাছে আমার মেয়েকে নিয়ে গেলাম। তিনি একটি পরীক্ষা করার পর দেখতে পেলেন যে, আমার মেয়ের চোখ পুরোপুরি সুস্থ।ঐ ডাক্তারকে যখন আমি পূর্বের রিপোর্টগুলো দেখালাম তিনি বললেন, এগুলো ছিঁড়ে ফেলে দাও। আর আমি ও আমার মা যাচাই করে দেখলাম যে, আমার গাউছুল আজমের দোয়ায় আমার মেয়ে পরিপূর্ণভাবে দেখতে পাচ্ছে”।

এখানেই শেষ নয়, চট্টগ্রাম জেলার রাউজানের কাগতিয়া দরবারে অবস্থানরত পীর কথিত গাউছুল আজম(তফজ্জল আহমদ) সৌদি আরবে অবস্থানকারী আব্দুল মালেক নামে এক ঘুমন্ত মুনিরীয়া অনুসারিকে স্বপ্ন দেখান যে, তার লুঙ্গিতে বিষাক্ত বিচ্ছু রয়েছে। ঘুম থেকে জেগে তিনি লুঙ্গি উল্টে-পাল্টে দেখেন। কিন্তু কোন বিচ্ছু খোঁজে পাননি। এ অবস্থায় তিনি ফের ঘুমিয়ে পড়েন। দ্বিতীয় দফায় আব্দুল মালেক স্বপ্ন দেখেন তার কোমরে লুঙ্গির গিট দেয়া স্থানে রয়েছে বিচ্ছু। ঘুম থেকে জেগে যান তিনি। পরণে থাকা লুঙ্গির গিট খোলেন। দেখতে পান সত্যিই বিচ্ছু আছে! তাড়াতাড়ি বিচ্ছুটি ফেলে দেন। এভাবে স্বপ্ন দেখিয়ে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে রক্ষা করেন কথিত গাউছুল আজম!

পবিত্র কোরআনে মৃত্যু সম্পর্কে যা বলা হয়েছে:  ‘নিশ্চয়ই মৃত্যুর সময় নির্ধারিত। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো মৃত্যু হতে পারে না। কেউ পার্থিব পুরস্কারের জন্যে কাজ করলে তাকে তার পুরস্কার ইহকালে দান করবো। আর যদি কেউ পরকালের জন্যে কাজ করে তবে তার পুরস্কার সে পরকালে পাবে। শোকরগোজার বান্দাদের কাজের ফল আমি নিশ্চয়ই দেবো।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৫)

একটি ভিডিও দেখা যায়, খোদ মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ফোরকান মিয়া এ ভন্ডামি বর্ণনা করছেন তার রচিত কবিতায়।

মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’র ব্যানারে পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে গাউছুল আজম’র নামে প্রাণঘাতি ‌‘বিচ্ছু’ কাহিনী বর্ণনা করে ভণ্ডামি চালিয়ে যাচ্ছে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’র সভাপতি ও মহাসচিব অধ্যাপক ফোরকান মিয়া। বানোয়াট মনগড়া এ কারামত বিশ্লেষণ করার আগে আমাদের জানতে হবে ‍‘বিচ্ছুকী?

বিচ্ছু। আট পায়ের ভয়ঙ্কর এক শিকারী প্রাণী। অনেকে আবার এদের বৃশ্চিক নামেও ডাকে।সারা পৃথিবীতেই ১৭৫০ জাতের বিচ্ছু রয়েছে।এর মধ্যে প্রায় পঁচিশ প্রজাতি চাইলেই বিষক্রিয়ায় মানুষ মেরে ফেলতে পারে। মারতে পারে অন্য যে কোনো প্রাণীকেও। নিজেদের শরীরের চেয়ে বড় প্রাণীকেও কাবু করে ফেলতে পারে অনায়াসে। বিচ্ছুর বড় লেজ আছে। যা সবসময় পিঠের উপর এসে ঘুরতে থাকে হেলিকপ্টারের পাখার মতো।  লেজের মাথায় আছে বিষাক্ত এক স্টিংগার। শিকারে বের হওয়ার আগে এই স্টিংগারটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বের হয়। এটা কাজ না করলে সহজে শিকারকে ঘায়েল করতে পারে না।বিচ্ছুর চিংড়ি মাছ আর কাঁকড়ার মতো তাদের শরীরে দুটো বড়ো চিমটাও আছে। এই দিয়ে যেটা একবার ধরবে তা আর ছোটানো সম্ভব হয় না।  নয় থেকে কুড়ি সেন্টিমিটারের বড় হয় না বিচ্ছু।

দিনে বিচ্ছু কিছুটা ভয় নিয়ে চলাফেরা করে।দিনের আলোয় ইট-পাথর বা গর্তে লুকিয়ে থাকে । অন্ধকার এদের খুব প্রিয়। এই অন্ধকারে ওরা খাবার খোঁজা থেকে শুরু করে যে কোনো জরুরি কাজ সেরে নেয়। দেখতে ছোটখাটো হলেও এরা পেটুক টাইপের। খুব খেতে পারে। পিঁপড়ে যেমন শরীর থেকে কয়েকগুণ ওজন বয়ে বেড়াতে পারে, এরাও নিজের শরীরের তুলনায় বেশি খাবার পেটে চালান করে দিতে পারে। এই অতিরিক্ত খাবারের ফলে এক বছরের মাথায় তারা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়।চীনাদের  প্রিয় খাবার এই আস্ত বিচ্ছু!

অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, উল্লেখিত দুটি ঘটনার পুরোটাই বানোয়াট। শুধু সাধারণ সরল মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে অর্থ হাতিয়ে নিতে এমন অলৌকিক ঘটনা বিভিন্ন পত্রিকায় ক্রোড়পত্র নামে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে।

মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হচ্ছেন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ বা নিউরোলজিষ্ট। তাদের মতে বিচ্ছু  বিষাক্ত প্রাণঘাতি একটি কিট। এটির জম্ম মস্তিস্কে হতে পারে না।মাথায় যদি বিচ্ছু থাকে মাথার সমস্যা হতে পারে চোখের সমস্যা হবে কেন? এ ধরনের বক্তব্য স্বাস্থ্য বিজ্ঞান সমর্থন করে না| সমর্থন করেন না ইসলামী বিশেষজ্ঞরাও।

চলবে

আরো পড়ুন :

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১৫ (রূহানী ডাক্তার)

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১৪( দুর্ঘটনায় রক্ষা )

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১৩(মৃত্যুকালে কলেমা পড়ান)

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১২(সুনামি তত্ত্ব ! )

মুনিরীয়ার ভণ্ডামী-১১ ( ঝুলন্ত কোরআন )

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১০ ( রাসুল (স:) সঙ্গে দৈনিক সাক্ষাৎ!

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৯ (তাজে গাউছিয়্যত )

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৮(খেলাফতের স্বাক্ষী যারা)

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৭(ভ্রান্ত যত মতবাদ)

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৬

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৫

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৪
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৩
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-২
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১