bnanews24.com
সাহারা খাতুন

স্যালুট কিংবদন্তি সাহারা খাতুন

।। মিজানুর রহমান মজুমদার।।
অ্যাডভেকেট সাহারা খাতুন। বাংলাদেশের এক কিংবদন্তি রাজনীতিক। এলিট পরিবারে জন্ম নেয়া সাহারা খাতুন ছিলেন মাটি ও মানুষের ভরসাস্থল, অতি আপনজন। জনকল্যাণই তার জীবনের মূলমন্ত্র। ১৯৪৩ সালে ১মার্চ জন্ম নেয়া এ নারী রাজনীতিকের সততা নিয়ে কারো প্রশ্ন নেই। ছাত্রজীবন থেকে বঙ্গবন্ধুর আর্দশের সৈনিক হিসাবে ২০২০সালের ৯ জুলাই পর্যন্ত মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেন। ভোগ বিলাস, দূর্নীতি থেকে দূরে ছিলেন।

তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি ছিলেন আস্থাভাজন। প্রধানমন্ত্রী তাকে বিশ্বাস করতেন । সেনা সমর্থিত তথা কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনেকে আপোষ করলেও সাহারা খাতুন আপোষ করেননি। প্রধানমনন্ত্রীর সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রাণালয়ের দায়িত্ব দেন। তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম নারী স্বরাস্ট্রমন্ত্রী। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহে সাহারা খাতুন সাহসিকতার পরিচয় দেন। বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য পিলখানা বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে গিয়েছিলেন। বিদ্রোহী জওয়ানদের আলোচনায় উদ্বুদ্ধ করতে এবং অস্ত্র সমর্পণে রাজি করান।

চরম বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায় দেশ ও জাতি। তিনি সাহসিকতা ও রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি মোকাবেলা না করলে ইতিহাস অন্যরকম হতো! বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য সাহারা খাতুন ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ৬ দফা, ১৯৬৮ সালে ছাত্রদের ১১ দফা,১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, একান্তর সালের মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা ছিল সাহারা খাতুনের।

৭৫’র পর স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময় নির্যাতন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন রাজপথে। আন্দোলন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে হরতাল, সভা-সমাবেশ করতে গিয়ে গ্রেফতার এবং নির্যাতিত হয়েছেন।আইন পেশায় নিয়োজিত থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের বহু সংখ্যক নেতাকর্মীর মামলা বিনাপয়সায় লড়েছেন তিনি। যারা আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন তাদের ভরসা ছিলেন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন।

শেখড় থেকে শিখরে আরোহণ করা অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন আমলাতান্ত্রিক জঠিলতার মাধ্যমে মানুষকে হয়রানি করাকে কখনো প্রশ্রয় দেননি। তার প্রমাণ শত শত। ২০১১ সালের কথা। বন্দর কাস্টমসের ছাড়পত্র থাকার পরও বাঙ্কার সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশী জাহাজে জ্বালানী তেল (ফার্নেস অয়েল) সরবরাহে আমলাতান্ত্রিক জঠিলতায় পড়ে। ফলে অনেক ব্যবসায়ি সীতাকুন্ডের শীপ ইয়ার্ডসহ বিছিন্নভাবে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত ফার্নেস অয়েল সরবরাহ করে আসছিলেন। ভুল তথ্য যায় অাইন শৃঙ্খলা বা‌হিনীর কাছে। তারা বেশ কয়েকটি ফার্নেস অয়েল ভর্তি লরি ও জাহাজ আটক করে। বিষয়টি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনকে জানানো হয়। তিনি তাৎক্ষনিকভাবে অাই‌জি‌পি ‘‌কে বলেন, এটি দেশের স্বার্থ বিরোধী কোন কাজ নয়- বরং দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে বেসরকারি বাঙ্কার সরবরাহকারিরা কাজ করে যাচ্ছে। একটি জাহাজ বন্দরে অতিরিক্ত সময় অবস্থান করলে ১০ হাজার ডলার পোর্টকে জরিমানা দিতে হয়। সরকারিভাবে তেল সরবরাহ করতে সময়ক্ষেপন হয়। এ অবস্থায় বেসরকারি বাঙ্কার সরবরাহকারিরা বিদেশী জাহাজে তেল সরবরাহ করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে।

এদেশে জ্বালানি পাওয়া না গেলে বিদেশী জাহাজ সূমহ বাংলাদেশে আসতে আগ্রহ দেখাবে না । আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়বে। যার প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে। তিনি বেসরকারি বাঙ্কার সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে হয়রানি না করার নির্দেশনা দেন। শুধু নিজ মন্ত্রণালয়ে নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধতা রাখেননি অভিজ্ঞ ও মেধাবি এ রাজনীতিক সাহারা খাতুন। তৎকালীন জ্বালানি সচিব,বানিজ্য সচিব, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের বেসরকারি বাঙ্কার সরবরাহকারিদের জন্য নীতিমালা করার বিষয়ে পরার্মশ দেন। বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি বাঙ্কার সররাহকারিদের জন্য একটি নীতিমালা প্রনয়ণ করার নির্দেশনা দেন।

ফলশ্রুতিতে ২০১৪ সালে বানিজ্য মন্ত্রণালয় একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। কিন্তু আবারো আমলাতান্ত্রিক জঠিলতার কারণে এর সুফল পায়নি বেসরকারি বাঙ্কার সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠান সমূহ। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সারা বিশ্বের বন্দর সমূহকে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) জলবায়ূ বিপর্যয় থেকে রক্ষার্থে শুণ্য দশমিক পাঁচমাত্রার বেশি সালফারযুক্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেয়। বাংলাদেশ আইএমও সনদে স্বাক্ষর করে।

২০১১ সালে অভিজ্ঞ ও মেধাবি রাজনীতিবিদ সাহারা খাতুন বুঝতে পেরেছিলেন দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বেসরকারি পর্যায়ে বাঙ্কার সরবরাহের বিকল্প নেই। তারই ধারাবাহিকতা নানা আমলাতান্ত্রিক ও সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে অবশেষে ২০২০ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বেসরকারি ব্যাঙ্কার এসোসিয়েশনভূক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) শুণ্য দশমিক পাচঁ সালফারমাত্রার ফার্নেস অয়েল (এফও) জাহাজে সরবরাহ করার অনুমতি দিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী সমুদ্র অর্থনীতির ফলশ্রুতিতে এ বছর বেসরকারি বাঙ্কার প্রতিষ্ঠানকে ডিলারশীপ প্রদান করা হয়। এতে বাংলাদেশ সমুদ্র অর্থনীতিতে আরো একধাপ এগিয়ে গেল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শীতা সমুদ্র অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ও ভাবনা বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের খাতায় নাম লেখানো এখন সময়ের ব্যাপার। কিন্তু যিনি বেসরকারি বাঙ্কার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশী জাহাজে জ্বালানি সরবরাহের অনুমোদন দেয়ার জন্য বিষয়ে অনড় ছিলেন সেই সাহারা খাতুন চলে গেছেন না ফেরার দেশে। বাংলাদেশ বাঙ্কার সাপ্লাইয়ার্স এসোসিয়েশন (বিবিএসএ) এর পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ‌হিসা‌বে আমি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তার মৃত্যুতে গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। স্যালুট, গণমানুষের নেত্রী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কিংবদন্তি অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ বাঙ্কার সাপ্লাইয়ার্স এসোসিয়েশন (বিবিএসএ)

আরও পড়ুন

করোনায় আক্রান্ত নৌ প্রতিমন্ত্রী

marjuk munna

ময়মনসিংহ, চুয়াডাঙ্গা ও নারায়ণগঞ্জে দুর্ঘটনায় ১৪জন নিহত

bnanews24

করোনায় একদিনে বিশ্বে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ২ লাখ ৩৬ হাজার

bnanews24