bnanews24.com
জাতীয় সংসদ লাইব্রেরি

যাদের জন্য লাইব্রেরি, তারাই যান না!

বিএনএ, ঢাকা: আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন বাংলাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ জাতীয় সংসদ লাইব্রেরির প্রাণ ফেরাতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েও অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে সংসদ সচিবালয়। সুপরিসর দৃষ্টিনন্দন পাঠকক্ষ, রেফারেন্স সার্ভিস, রিসার্চ সার্ভিস, ইন্টারনেটসহ এখানে থাকা আধুনিক নানা সুবিধাও টানতে পারছে না বই পড়ায় বিমূখ এমপিদের।

সিনিয়ররা তো যানই না ওদিকটায় পা মাড়ান না নবীন এমপিরাও। অথচ নবীন এমপিদের সংসদ কার্যপ্রণালী সম্পর্কিত জ্ঞান আহরণের জন্যই লাইব্রেরির সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। এমপিদের জ্ঞানার্জনের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে সংগ্রহ করে প্রায় ৮৬ হাজারের অধিক বই সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে এখানে। তারপরও এখানে না এসে জ্ঞানার্জনের জন্য এমপিরা নানা ছুতোয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর মাধ্যমে বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সংসদের গৃহীত নানা প্রকল্পের টাকায় তারা বিশ্বভ্রমণে গিয়ে আনন্দ উপভোগ করতেই আগ্রহ দেখান।

দেশের বিশিষ্টজনরা সমৃদ্ধ এই লাইব্রেরিটি ব্যবহার করলেও যাদের জন্য এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেই এমপিরা লাইব্রেরি ব্যবহার না করায় অসন্তুষ্ট সেখানকার কর্মরতরাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, এমপিরা তো নানান কাজে ব্যস্ত থাকেন। বই ও পত্রিকা পড়ায় তাদের আগ্রহ কম। আগে তবু্ও কিছু এমপি এখানে আসতেন, বই নিতেন। করোনার পর এ পথ এখন ভুলেই গেছেন তারা।

তবে সিনিয়র একজন পার্লামেন্টারিয়ান এ বিষয়ে বলেন, লাইব্রেরিতে বিভিন্ন দেশের সাংবিধানিক বই আছে। লাইব্রেরি ছাড়া একজন রাজনীতিক অসম্পূর্ণ থেকে যান। মাঠে বক্তব্য দেয়া এক জিনিস আর পার্লামেন্টে স্পিচ (বক্তব্য) অন্য জিনিস। সেজন্য লাইব্রেরি ভেরি মাচ হেল্পফুল।

তিনি বলেন, রাজনীতির একটা গুণগত পরিবর্তন দরকার। রাজনীতিবিদদেরই রাজনীতি করা দরকার। রাজনীতিকরা যদি ব্যবসা বেছে নেন, তাহলে তাদের চিন্তাটা ব্যবসার দিকেই যায়। কতো টাকা ইনভেস্ট করলে কত মুনাফা আসবে সেই ভাবনাই মাথায় ঘুরপাক খায়। এ কারণেই হয়তো অনেকে অনীহা দেখান।

এদিকে সংসদ সচিবালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, লাইব্রেরি ব্যবহার করে জ্ঞানের দরজা খোলার আগ্রহ না থাকলেও জ্ঞানার্জনের জন্য এমপিদের বিদেশ ভ্রমণের আগ্রহ অনেক বেশি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ীগুলোর সদস্য হিসেবে তারা নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জ্ঞানার্জন করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করতে যান অতি উৎসাহের সঙ্গে। এমনকি অনেক এমপি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে বলেছেন এমন একাধিক ঘটনাও রয়েছে।

বাংলাদেশের আইনপ্রণেতাদের সুবিধার্থে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের গণভবনে ১৯৭২ সালে সংসদ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে এটি বর্তমান সংসদ ভবনে স্থানান্তরিত হয়। অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের আইনসভার নথিপত্র থেকে পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সংসদীয় কার্যক্রমের এক বিশাল সংগ্রহশালা এই লাইব্রেরি। বিশ্বের বিভিন্ন জার্নাল, আইন, অধ্যাদেশ, ঘোষণা, সামরিক বিধি, সরকারি গেজেট, সংসদের বিতর্ক, অ্যাটলাস, মানচিত্র, গবেষণাপত্র, আউট অব প্রিন্ট বহু দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থসহ এই লাইব্রেরির বইসংখ্যা ৮৬ হাজারের অধিক।

সংসদ ভবনের নিচতলায় অবস্থিত জাতীয় সংসদ লাইব্রেরি এমপি, গবেষক ও সংসদ সচিবালয়ের স্টাফদের জন্য প্রতিদিন উন্মুক্ত থাকে। শুক্র ও শনিবার বন্ধের দিন হলেও লাইব্রেরিটি সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। অন্যান্য দিন খোলা থাকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। এতে রয়েছে সুপরিসর দৃষ্টিনন্দন পাঠকক্ষ। রেফারেন্স সার্ভিস, রিসার্চ সার্ভিস, ইন্টারনেটসহ আধুনিক নানা সুবিধা।

এমপিরা নিয়মিত লাইব্রেরিতে আসবেন, সংসদীয় রীতি-নীতি ও আইনের নানা ব্যাখ্যা নিয়ে নতুন এমপিরা ইতিহাস থেকে পাঠ নিয়ে সমৃদ্ধ হবেন বলেই সংসদ লাইবে্ররির প্রতিষ্ঠা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি সংসদ লাইব্রেরির রেজিস্ট্রারের অধিকাংশ পাতাই থাকে শূন্য। সংসদ অধিবেশন চলাকালীনও লাইব্রেরিতে ১০ জন এমপির সমাবেশও ঘটে না। লাইব্রেরি থেকে বাসায় নিয়ে এমপিদের বই পড়ার ব্যবস্থা থাকলেও বই ইস্যুর পরিসংখ্যান খুবই নগন্য।

লাইব্রেরির এক কর্মকর্তা জানান, অধিবেশন চলাকালে লাইব্রেরিতে এমপিদের যাতায়াত কিছুটা বাড়ে। রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বাজেট-সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করতে বছরের প্রথম অধিবেশন ও বাজেট অধিবেশনে এমপিদের উপস্থিতি কিছুটা হলেও দেখা যায়। এছাড়া অন্য সময়ে যারা এসেছেন তাদের অনেকেই শুধু পত্রিকা পড়ে চলে গেছেন।

এ বিষয়ে লাইব্রেরি কমিটির সভাপতি ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া বলেন, যারা প্রবীণ এমপি তাদের অনেকেই এখন আর লাইব্রেরিতে যাননা। আর নতুন এমপিরা তো একদমই লাইব্রেরিমুখী নন। এজন্য লাইব্রেরি সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। যাতে নতুনরা অন্তত লাইব্রেরিতে গিয়ে বসেন। কম করে হলেও একটি ম্যাগাজিন পড়েন। তাতে কিছুটা হলেও তাদের জ্ঞান আহরণ হবে।

তিনি বলেন, সংসদের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে শুরুতে নতুন এমপিদের সীমিত আকারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারপরও কীভাবে স্পিকারকে সম্বোধন করতে হয়, পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে কোন বিষয়ে কথা বলতে হয়, নোটিশ দিতে হয় কিভাবে, সংসদ অধিবেশন শুরুর কতো সময় আগে জরুরি ভিত্তিতে নোটিশ দেওয়ার নিয়ম আছে-এই বিষয়গুলো অনেক তরুণ এমপিই জানেন না। এই বিষয়গুলো সম্পর্কিত বই, আইন এবং সংসদ কার্যাবলী সম্পর্কিত বিধি বিধান লাইব্রেরিতে পাওয়া যায়। এ ছাড়াও অধিবেশন চলাকালীন সংসদে যেসব নিয়ম মেনে চলা জরুরি সে বিষয়গুলোও জানা যায় এই লাইব্রেরি থেকে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমাদের অনেক এমপিই এই সুযোগটা নিচ্ছেন না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, সংসদের সদস্যদের একটা বড় অংশেরই ক্যারিয়ার হিসেবে পলিটিক্স নেই। ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ানরা ফুল টাইম রাজনীতি করেন, আর আমাদের এখানে পার্ট টাইম। সেজন্য ব্যয় করার মত সময় তাদের নেই।

এছাড়া জাতীয় সংসদে বিতর্ক না হওয়াও সংসদের লাইব্রেরিতে এমপিদের না যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, সংসদে বিরোধী দল কি আছে? বিরোধী দল যদি কোনো কিছু নিয়ে কাউন্টার প্রস্তাব দিত তাহলে ডিবেট হত। বিতর্কের প্রয়োজনে নিজেকে প্রস্তুত করতে লাইব্রেরির প্রয়োজন হতো। এখন ডিবেটও নেই তাই এমপিদের লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তাও নেই বলে মনে করেন তিনি।

বিএনএনিউজ/এফএস,মনির

আরও পড়ুন

আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের এক সদস্য আটক

bnanews24

ডেঙ্গু দমনে ম্যাপ করে ব্যবস্থা নিন-চবি শিক্ষক

bnanews24

নিবার্চন কমিশনে রদবদল

bnanews24