bnanews24.com

বঙ্গবন্ধু যেভাবে বিশ্ববন্ধু

।।ইয়াসীন হীরা।।

I have not seen the Himalayas. But I have seen Sheikh Mujib. In personality and
in courage, this man is the Himalayas. I have thus had the experience of witnessing
the Himalayas.

(আমি হিমালয় দেখিনি, তবে আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটি হিমালয়ের সমতুল্য। আর এভাবেই আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করেছি)।

১৯৭৩ সালে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে কিউবার প্রেসিডেন্ট প্রয়াত বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলিঙ্গন করে এমন উক্তি করেছিলেন। শুধু ফিদেল কাস্ত্রো নয়, সারাবিশ্বের জনগণ মনে করেন, ব্যক্তিত্ব ও সাহসে শেখ মুজিব ছিলেন হিমালয় পর্বত সমতুল্য। বঙ্গবন্ধু তার প্রমাণ দিলেন ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন ও ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে। দর্শন ও চিন্তা- চেতনায় তিনি আলো ছড়িয়েছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব, দর্শন, চিন্তা-চেতনার গ্রহণযোগ্যতা ছিল সার্বজনীন। এর অনন্য উদাহরণ ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে আসেন। আর ফিরে আসার পরপরই ১৩-১৭ মার্চ ভারতের সেনাবাহিনীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি ছিল ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়। জাতিগত দাঙ্গা, ধর্মীয় উগ্রবাদকে তিনি কখনও প্রশ্রয় দেননি। যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, মানবতার ওপর আঘাত এসেছে সেখানে প্রতিবাদ করেছেন। ১৯৭৩ সালে
ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।

প্রসঙ্গত, ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে শেখ মুজিবুর রহমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং শান্তি বজায় রাখার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নিজের জীবন বাজি রেখে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নিরীহ মানুষদের জীবন রক্ষা করেন। ১৯৪৭ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে অনশন করেন সে সময়কার তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৮ সালে ভারত ও পাকিস্তান পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনিন ভারত এবং পাকিস্তানের পাশাপাশি তৃতীয় রাষ্ট্র হিসেবে স্বতন্ত্র, স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য মহাত্মা গান্ধীর সহযোগিতা চান। এ দাবিতে পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনে যোগ দেন। যদিও এই উদ্যোগে সাড়া দেয়নি ভারত ও পাকিস্তান। কিন্তু পরবর্তীতে এটিই ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ গড়ার ভিত্তি।

বঙ্গবন্ধুর মাত্র সাড়ে তিন বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়। তিনি বাংলাদেশ ও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাঁর পদক্ষেপগুলো সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পায়। সেকারণে ১৯৭৩ সালের ২৩ মে বিশ্বশান্তিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব শান্তি পরিষদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জুলিও কুরি’পুরস্কারে ভূষিত করে।

ইতিহাসের এ মহানায়কের নেতৃত্বে বাংলাদেশ খুব অল্প সময়ে জাতিসংঘ, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, কমনওয়েলথসহ ১৪টি আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্যপদ লাভ করেছিল। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুবরণ করার পরও বিশ্বরাজনীতিতে ছিলেন একটি রোল মডেল। তাঁর মৃত্যুর ৪৪ বছর পর ২০১৯ সালে ১৬ আগস্ট প্রথমবার জাতিসংঘ সদও দপ্তরে জাতীয় শোক দিবস পালন করা হয়। শোক দিবসে বিশে^র কূটনীতিকরা বলেন, শেখ মুজিব শুধু ‘বঙ্গবন্ধু’ নন, তিনি ‘বিশ্ববন্ধু’। কেন বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববন্ধু উপাধি দেওয়া হলো? এবার তার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণে আসা যাক।

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সাল। নিউইয়র্ক সময় বিকেল চারটা। ইতিহাসের এক স্মরণীয় দিন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে আহ্বান জানান, অধিবেশনের সভাপতি আলজেরিয়ার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল আজিজ ব্যুতফলিকা। দৃপ্ত পায়ে বক্তৃতা মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান ব্যাকব্রাশ করা চুল, গলাবন্ধ কোট, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, দীর্ঘদেহী স্মার্ট সুদর্শন আর আভিজাত্যপূর্ণ এক সৌম্য ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু। নিজ আসন থেকে উঠে এসে এক সপ্তাহ আগে সদস্যপদ পাওয়া বাংলাদেশের স্থপতিকে মঞ্চে তুলে নেন আব্দুল আজিজ ব্যুতফলিকা। করতালি ও দাঁড়িয়ে সম্মান জানান উপস্থিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানরা।

বাঙালি জাতির সম্মান ও গৌরবের এ দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দিয়ে ইতিহাস গড়েন। ভাষণে বাংলাদেশের স্বপ্ন, জনগণের আকাক্সক্ষার পাশাপাশি অশান্ত বিশ্বরাজনীতির চিত্র তুলে ধরে ক্ষান্ত হননি। দৃঢ়তার সঙ্গে সারাবিশ্বের নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন বাংলাদেশের জাতির জনক।

কেন উন্নত দেশগুলোর মারণাস্ত্র বিকিকিনি ও দখলদারিত্ব রাজনীতির বিপক্ষে বাংলাদেশ? কেন বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে জোট নিরপেক্ষ আলাদা প্লাটফর্মে? কেন বাংলাদেশ সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিল? এসব বিষয় যুক্তিভিত্তিক চমৎকার ব্যাখ্যা করেন অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব। জাতিসংঘে বাংলায় দেয়া ভাষণের শুরু করেন এভাবে, ‘আজ এই মহামহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সঙ্গে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগিদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত’।

মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ ও নির্যাতিত মা-বোনদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন জাতির জনক। একইসঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সমর্থনকারী সব দেশ ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘স্বাধীনভাবে বাঁচিবার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচিবার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাঁহারা বিশ্বের সকল জাতির সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্য আকাক্সিক্ষত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে, আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন।

বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘একদিকে অতীতের অন্যায়-অবিচারের অবসান ঘটাইতে হইতেছে, অপরদিকে আমরা আগামীদিনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইতেছি। আজিকার দিনের বিশ্বের জাতিসমূহ কোন পথ বাছিয়া নিবে তাহা লইয়া সঙ্কটে পড়িয়াছে। এই পথ বাছিয়া নেওয়ার বিবেচনার উপর নির্ভর করিবে আমরা সামগ্রিক ধ্বংসের ভীতি এবং আণবিক যুদ্ধের হুমকি নিয়া এবং ক্ষুধা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে মানবিক দুর্গতিকে বিপুলভাবে বাড়াইয়া তুলিয়া আগাইয়া যাইব অথবা আমরা এমন এক বিশ্ব গড়িয়া তোলার পথে আগাইয়া যাইব যে বিশ্ব মানুষের সৃজনশীলতা এবং আমাদের সময়ের বিজ্ঞান ও কারিগরি অগ্রগতি আণবিক যুদ্ধের হুমকিমুক্ত উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের রূপায়ণ সম্ভব করিয়া তুলিবে’।

বাঙালি জাতির উদারতার বিষয়টি উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত ও নেপালের সঙ্গে শুধুমাত্র প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কই প্রতিষ্ঠা করি নাই, অতীতের সমস্ত গ্লানি ভুলিয়া গিয়া পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক করিয়া নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করিয়াছি।’

বিশ্বরাজনীতির মাইলফলক খ্যাত এ ভাষণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ব্যাখ্যা করেন জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখ-তার প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিবেশী সব দেশের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় বজায় রাখিবে। আমাদের অঞ্চলের এবং বিশ্বশান্তির অন্বেষায় সকল উদ্যোগের প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকিবে।’

ভাষণ শেষ করার আগে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘জনাব সভাপতি, মানুষের অজেয় শক্তির প্রতি বিশ্বাস, মানুষের অসম্ভবকে জয় করার ক্ষমতা এবং অজেয়কে জয় করার শক্তির প্রতি অকুণ্ঠ বিশ্বাস রাখিয়া আমি আমার বক্তৃতা শেষ করিতে চাই।
আমাদের মতো যেইসব দেশ সংগ্রাম ও আত্মদানের মাধ্যমে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে, এই বিশ্বাস তাঁহাদের দৃঢ়। আমরা দুঃখ ভোগ করিতে পারি। কিন্তু মরিব না। টিকিয়া থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করিতে জনগণের দৃঢ়তাই চরম শক্তি।
আমাদের লক্ষ্য স্বনির্ভরতা। আমাদের পথ হইতেছে জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও যৌথ প্রচেষ্টা।’

বক্তৃতার শেষাংশে বাঙালি জাতির শক্তি সাহসের বিষয়টি বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমাদের নিজেদের শক্তির ওপর আমাদের বিশ্বাস রাখিতে হইবে। আর লক্ষ্যপূরণ এবং সুন্দর ভাবীকালের জন্য আমাদের নিজেদেরকে গড়িয়া তুলিবার জন্য জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমেই আমরা আগাইয়া যাইব।

বঙ্গবন্ধুর এমন দিকনির্দেশামূলক ভাষণ বিশ্বনেতাদের মুগ্ধ করে। ভাষণ শেষে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সভাপতিসহ উপস্থিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক, প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষক, সাংবাদিকরা দাঁড়িয়ে, করতালি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দিত করেন। অনেকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করেন।

অধিবেশনে উপস্থিত বিশ্বনেতা, প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকরা যেন এ ক্ষণটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন! জাতিসংঘ অধিবেশনে সচরাচর সবাই উপস্থিত থাকেন না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সময় অধিবেশন কক্ষ ও গ্যালারি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। কারণ শেখ মুজিবুর রহমান একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী নন- বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্থপতি। সম্মোহনি নেতৃত্ব ও আপসহীন সংগ্রামের কারণে আগে থেকেই এ মহান নেতার দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ছিল। পুরো বিশ^ দেখলো ব্যক্তিত্ববান নেতা শেখ মুজিবকে। শুনলো তার বজ্রকন্ঠ। উল্লেখ, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া সেই কালজয়ী ভাষণটির ইংরেজি অনুবাদ পড়ে শোনান কূটনীতিবিদ ফারুক চৌধুরী।

বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সচেতনভাবে নিজ থেকেই বাংলায় ভাষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বাংলা ভাষা ও বাংলা নামের দেশের জন্য গণমানুষের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ বিশ^বাসীকে স্মরণ করিয়ে দিতে এমন সিদ্ধান্ত নেন তিনি। অভূতপূর্ব স্মরণীয় এ ভাষণের অর্ধশত বছর পার হয়েছে। অনেক নেতা জাতিসংঘে বাংলাদেশের হয়ে বক্তৃতা করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ভাষণকে কেউ অতিক্রম করতে পারেননি।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভাষণটিতে শুধু অশান্ত বিশ্বের শান্তির বার্তাই ছিল না, ছিল একটি দিক নিদের্শনা। এ ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করেছেন তিনি শুধু বাংলাদেশের নেতা নন, সারাবিশ্বের নিপীড়িত মানুষেরও নেতা। বঙ্গবন্ধুকে ‘কিংবদন্তির নায়ক মুজিব’ বলে অভিহিত করেছিলেন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব। প্রশংসা করা হয় জাতিসংঘের ডেলিগেট বুলেটিনেও। এতে লেখা হয় ‘অতীতের অনগ্রসরতা, যুদ্ধের ধ্বংসলীলা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও প্রতিকূল বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াবহ ফলশ্রুতি হিসেবে যে অসুবিধাজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলা অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশের নেতা মুজিব তাঁর বক্তব্যে সেটি তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন।’

শুধু জাতিসংঘ নয়, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে প্রথমবারের মতো যোগ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৩ সালের ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত হয় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলন। এতে প্রথমবার যোগ দিয়ে বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হন বঙ্গবন্ধু। সম্মেলনে সৌদি বাদশাহ ফয়সাল, যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো, মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফিসহ অন্যান্য বিশ্বনেতারাও অংশ নেন।

সম্মেলনে দুইদফা বক্তব্য রাখেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। ৮ সেপ্টেম্বর স্বাগত ভাষণে সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদবিরোধী মজলুম জনগণের ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনে জানাতে ‘জোটনিরপেক্ষ নীতি’ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেন, ‘আমি শুরুতেই জাতীয়তাবাদী মুক্তি আন্দোলনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের যেসব গণমানুষ শহীদ হয়েছে তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম আজও অব্যাহত ভিয়েতনাম, অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, নামিবিয়া, গিনি বিসাওসহ ল্যাটিন আমেরিকা ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। তাই একটি বৈষম্যহীন পৃথিবী গড়তে আমাদের সবাইকে এক হয়ে শোষিতের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

পরের দিন ৯ সেপ্টেম্বর বিদায়ী ভাষণেও বঙ্গবন্ধু বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘উপমহাদেশকে শান্তিপূর্ণ রাখতে হলে, যে কোনো সমস্যার মানবিক সমাধান খুঁজতে হবে। একটি সমৃদ্ধ বিশ্বের জন্য আমাদের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের ওপর জোর দিতে হবে। আমি আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই এখানে এক হওয়ার জন্য। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সদস্য দেশগুলোর পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার প্রত্যয় দেশগুলোর সামাজিক সমৃদ্ধি আনতে পারে।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন সম্মেলনে ভাষণটি ছিল নিপীড়িত মানুষের পক্ষে পরাশক্তিগুলোর জন্য একটি বার্তা। তিনি পরাশক্তিগুলোর অস্ত্র রাজনীতি বন্ধের উদ্দেশে বলেন, ‘পৃথিবী আজ দুইভাগে বিভক্ত। এক ভাগে শোষক শ্রেণি, আরেক ভাগে শোষিত। আমি শোষিতের দলে।

এ বক্তব্য দিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে আসার পর কিউবার প্রেসিডেন্ট প্রয়াত বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরেন। আলিঙ্গন করে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে একটি বুলেট তোমাকে খুঁজে বেড়াবে, সাবধানে থাকো! কাস্ত্রো’র সতর্কবাণীর দু’বছর পার না হতেই সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু উচ্চবিলাসী রাজনীতিক ও সেনা সদস্যের বুলেট হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে খুঁজে পেয়েছিল। অবসান হয়, বিশ্বনেতা বাংলাদেশের জাতির জনকের ৫৫ বছরের বর্ণাঢ্য ঐতিহাসিক রাজনৈতিক জীবনের। পিছিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশের উন্নয়নের সব ধরনের সূচক।

বাংলাদেশের স্থপতিকে হত্যার প্রচেষ্টা হয়েছিল বারবার। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে। পাকিস্তানের কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়া হবে এমন খবর প্রকাশ হয় বিশ্বমিডিয়ায়। ১৯৭১ সালের ২২ জুলাই কলকাতায় বুদ্ধিজীবী-জনতার এক প্রতিবাদ সভা ডাকা হয়। কলকাতার কবি ও ছড়াকার অন্নদাশঙ্কর রায় সভা মঞ্চে উপস্থিত থাকবার কথা ছিল। কিন্তু লাখো মানুষের ভীড় ঠেলে মঞ্চ পর্যন্ত যেতে পারেননি।
মর্মাহত কবি-ছড়াকার অন্নদাশঙ্কর রায় রাতে বাড়ি ফিরে লেখেন,

যতদিন রবে পদ্মা যমুনা
গৌরী মেঘনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান
দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা
রক্তগঙ্গা বহমান
তবু নাই ভয়
হবে হবে জয়
জয় মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু নেই। কিন্তু রয়েছে তাঁর দর্শন। যে দর্শন শুধু বাঙালির হৃদয়কে জয় করেনি- জয় করেছে বিশ্ববাসীর হৃদয়ও। বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে স্থান দিতে শ্রীলঙ্কার প্রয়াত সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষণ কাদির গামা বলেছিলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া গত কয়েক শতকে বিশ্বকে অনেক শিক্ষক, দার্শনিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধা উপহার দিয়েছে, কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুকে ছাপিয়ে, তাঁর স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে।’ হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙ্গালী শেখ মুজিবুর রহমান কর্ম ও দর্শনের মাধ্যমে শুধু ‘বঙ্গবন্ধু হননি, হয়েছেন ‘বিশ্ববন্ধু’।

সূত্র: চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে)এর মূখপত্র বার্তাজীবী’র মুজিব শতবর্ষ সংখ্যা ২০২০
——————————————————————————————————————————————————————-

লেখক: হেড অব নিউজ-বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ), সাবেক প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক- চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে)

আরও পড়ুন

ট্রেনবহরে হামলার ঘটনার রায়ে জাতি বিস্মিত-মির্জা ফখরুল

RumoChy Chy

পানিতে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু

RumoChy Chy

বিকাশ অ্যাপে বড় পরিবর্তন, বন্ধ হবে প্রতারণা

bnanews24