bnanews24.com
মৌলভী ছৈয়দ ছোলতানের ৫০তম মৃত্যু বার্ষিকী ১৭ জানুয়ারি

নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির অগ্রদূত মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান স্মরণে

।।সোহেল মো. ফখরুদ-দীন।।

শিক্ষকতা মহান ও পবিত্র পেশা। জাতীর ও সভ্যতার উন্নয়নের নিবেদিত মানবতার কল্যাণময় মহান এ দায়িত্বটা যাঁরা পালন করেন তাঁরাই শিক্ষক ও সমাজ শিক্ষক আলোকিত মানুষ। জন্মের পর সন্তানরা পৃথিবীর আলো দেখতে পায়। কিন্তু জন্মের স্বার্থকতাকে শিক্ষা লাভের মাধ্যমে পরিপূর্ণ জীবন দান করেন শিক্ষক। আমাদের পরম শ্রদ্ধেয়, পূজনীয় এ সমাজ দরধী মানুষই শিক্ষক। আমাদের জাতির দূর্ভাগ্য যে- সেই মহান শিক্ষককে আমরা যথাযথ কদর-মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছি বারেবারে। তেমনি মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত আমাদের চট্টগ্রামের সন্তান ও উপ-মহাদেশের প্রাইমারী শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রপথিক মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান অন্যতম। ছৈয়দ ছোলতান নিখিল বঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আজকের প্রাইমারী শিক্ষা আন্দোলনকে যথাযথ স্বীকৃতি আদায় করে বর্তমান অবস্থানে আনতে সক্ষম হয়েছিল। সেজন্য তিনি হাসি-মুখে জেল পর্যন্ত বৃটিশ আমলে বরণ করেছেন। বাঙালীদের শিক্ষার ব্যাপারে সচেতনতা করার অপরাধে বৃটিশ বাহিনীর হাতে বারে বারে নির্যাতিত হন। নির্যাতন আর অন্ধকার কারাবরণেও সৈয়দ সোলতানকে ধাবিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি তাঁর শিক্ষার উন্নয়ন আন্দোলনে ব্রত হয়ে সফলতা লাভ করেছেন।

ছৈয়দ সোলতান একাধারে শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক, চিন্তাবিদ, গবেষক ও সাংবাদিকতার অবদান রেখে সমগ্র ভারতবর্ষে উদ্ভাসিত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সম্মত হন। কিন্তু আমরা দূর্ভাগা জাতি যে, এত বড় গুণী মানুষকে আমরা জীবিত অবস্থায় মূল্যায়ন তো হয়নি, মৃত্যুর পর ও কোন সরকার মূল্যায়ন করতে এগিয়ে আসেননি, বর্তমানে আমরা ভুলে যেতে বসেছি এ প্রয়াত গুণী শিক্ষা দরদীকে।

মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ এর জন্ম ১৯০২ সালের ১৪ এপ্রিল সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামের ছৈয়দ বাড়ীতে। তাঁর পিতা ছিলেন তৎকালীন খিলাফত আন্দোলনের একনিষ্ট কর্মী মরহুম আলহাজ্ব মওলানা ছৈয়দ আলিম উল্লাহ্ শাহ্। মায়ের নাম লতিফা খাতুন। ছৈয়দ ছোলতান একদিকে বৃটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের কারাবরণ কারী সৈনিক, অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষক সমাজের সুযোগ-সুবিধা ও দাবী-আদায়ের লক্ষ্যে সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন, নিপীড়িত নিগৃহীত ও নির্যাতিত হয়েছেন। এ ছাড়া তিনি নিরলস পরিশ্রমী সফল সংগঠক ও সমাজসেবী ছিলেন। কালারপুল মাদ্রাসা ও সাতকানিয়া হাই স্কুলে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবকদের নেতৃত্বদেয়ার জন্য লেখাপড়া কিছুদিন ত্যাগ করেন এবং পরে চট্টগ্রামে অস্থায়ী ন্যাশনাল স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখা পড়া চালিয়ে যান। ১৯২৮ সালে ফেনী মাদ্রাসা থেকে ইংরেজী সহ প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে মোয়াল্লিম ট্রেনিং পাশ করেন।

মওলানা মরিুজ্জামান ইসলামাবাদী ও মহাকবি ইসমাইল হোসেন সিরাজীর নির্দেশে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। মওলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ ১৯২৭ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি গঠন করেন ও এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর পর থেকে তাঁর চিন্তা শুরু হয় সমগ্র উপমহাদেশের শিক্ষকদের কল্যাণের লক্ষ্যে শিক্ষকদের সংগঠিত করার জন্য।

১৯২৮ সাল। কলিকাতায় চলছিল অল ইন্ডিয়া কংগ্রেসের সম্মেলন। তিনি কংগ্রেস সদস্য হিসেবে সম্মেলনে যোগদেন। সম্মেলনের এক ফাঁকে পূর্ব পরিকল্পনা মত শিক্ষকদের নিয়ে সমাবেশ করেন এবং নিখিল বঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি গঠন করেন। সমাবেশ শেষে সর্ব সম্মতিক্রমে শেরে বাংলা এ,কে, ফজলুল হক সভাপতি, স্যার আজিজুল হক সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম সাতকানিয়া মওলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এবার তাঁর স্বপ্ন জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের দিকে পা বাড়ায়। শিক্ষক সমিতির ব্যানারে সংগঠিত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে (উপমহাদেশে) শিক্ষক সমাজ নিজেদের সমস্যা, চিহ্নিত ও সমাধানের উপায় নির্ধারণ ও শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

ছৈয়দ ছোলতান ১৯২৬ সালে নিজ গ্রামের দরগাহচর নামক স্থানে মার্দাশা-সোনাকানিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন (বর্তমানে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়)। তিনি দীর্ঘদিন এ স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদও অলংকৃত করেন। ১৯৫১ ও ১৯৬৪ সালে তিনি দেশব্যাপী শিক্ষক ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫০ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও জেলা স্কুল বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন।

ছৈয়দ ছোলতান ১৯৫২ সালে চট্টগ্রামের পূর্ব পাকিস্তান প্রাথমিক শিক্ষক সম্মেলন আহ্বান করেন। যার উদ্ভোধক ছিলেন শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক। একদিকে শিক্ষকদের নিয়ে আন্দোলন অন্যদিকের দেশ প্রেমিক রাজনীতিক হওয়ায় বৃটিশ সরকারের কু নজর ছিলেন তাঁর উপর। ১৯৪৪-৪৫ সালে মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতার লক্ষ্যে এক গোপন সরকার গঠিত হয়। মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ ছিলেন ওই গোপন সরকারে মন্ত্রীসভার একজন সদস্য। আবার, আজাদ হিন্দ ফৌজের বিপ্লবী কমিটিরও নেতৃত্ব দেন। এসব কারণে বৃটিশ সরকারের রোষানলে পড়ে ১৯৫৪ সালে তাঁকে ১০ মাস কলিকাতা ও রংপুরে কারাবরণ করতে হয়। পরবর্তীতে ও দীর্ঘকাল তাঁকে গৃহথেকে দূরে থাকতে হয়েছে শিক্ষকদের দাবী ও রাজনীতির কারণে। তিনি নিখিল বঙ্গ কংগ্রেস, জমিয়তে ওলামা ও কৃষক প্রজা পার্টির অন্যতম সংগঠক ছিলেন।

চট্টগ্রাম কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা, সাতকানিয়া কলেজ, দেওদীঘি হাইস্কুল, মির্জাখীল হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় অংশ নেন। তিনি চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমবায় সমিতি, ফকির মাওলানা হাঙ্গর খাল সমবায় সেচ সমিতি, সোনাকানিয়া ইউনিয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতি ও বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান) সমাজ কল্যাণ সমিতি গঠন করেন। দেশ, মাটি ও মানুষের প্রতি কল্যাণ সাধন ছিল তার জীবনের মূল লক্ষ্য। সারাজীবন খদ্দের কাপড় পরিধান করেছেন তিনি।

১৯৪৬ সালে সংসদ নির্বাচনে বৃহত্তর সাতকানিয়া আসন থেকে মনোনয়ন পত্র পেশ করেন কিন্তু কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করে নেন এবং পটিয়া আসনের প্রার্থী মওলানা মনিরজ্জুমান ইসলামাবাদীর পক্ষে নির্বাচনী কাজে অংশ নেন। ১৯৪৭ সালে তিনি পবিত্র হজ্ব আদায় করেন। আলহাজ্ব মওলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ ৩ পুত্র ও ১ কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন।

শিক্ষক, রাজনীতিক, সমাজদরদী এই মহা মানুষটি ১৯৭০ সালে ১৭ জানুয়ারি সোনাকানিয়া গ্রামে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর পরম ইচ্ছানুসারে তার বাড়ির সামনে  হযরত আল্লামা শরফুদ্দিন কাতালপীর(র.) মাজার সংলগ্ন স্থানে(মনজিলের দরগাহ নামক স্থানে) কবর দেওয়া হয়।

১০০০সালের দিকে তৎকালীন দিল্লির বাদশাহ ইসলামের প্রচারকাজের জন্য  লাখেরাজ সম্পত্তি দিয়ে হযরত কাতালপীর(র.) ভাগিনা হযরত আল্লামা শরফুদ্দিন কাতালপীর(র.) কে সোনাকানিয়ায় নিযুক্ত করেছিলেন। তখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই এলাকাটি ছিল মগদের বসতি। তার ইসলাম প্রচার ও দলে দলে লোকজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করলে  ১০ই মহরম সকালে তাকে নামাজরত অবস্থায় কতল করা হয়েছিল। খবরটি প্রচারিত হলে মগরা ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরে চট্টগ্রাম থেকে মুসলমান ও মগ নেতারা গিয়ে তাকে ঘটনাস্থলে দাফন করেন। সে থেকে এলাকাটিতে প্রতি বছরের ১০ই মহরম মেলা বসে( যা মনজিল নামে পরিচিত)। আল্লামা শরফুদ্দিন কাতালপীর(র.) কোন বংশধর ছিল না।

মরহুম ছৈয়দ ছোলতান আহমদসহ তার পূর্ব পুরুষগণ  হযরত আল্লামা শরফুদ্দিন কাতালপীর(র.) দরগাহের আজীবন মোতোয়াল্লী ছিলেন।

এর প্রায় ২শ বছর পর একই লাখেরাজ সম্পত্তি দিয়ে ছৈয়দ ছোলতানের পূর্ব পুরুষ আল্লামা আতি উল্লাহ বিন ছৈয়দ মুসা(র.) কে  একই স্থানে প্রেরণ করেন সসাময়িক দিল্লির মুসলিম শাসক।

তাঁর ৫০ তম মৃত্যু বার্ষিকীতে রইলো শ্রদ্ধা।মহান আল্লাহতায়ালা তাকে বেহেস্ত নসিব করুন।আমিন।

লেখক: ইতিহাসবেত্তা, প্রাবন্ধিক ও গ্রন্থপ্রনেতা।
১৬/০১/২০২০খ্রিঃ, ০১৮১৯-৯৫৮৮১২

আরও পড়ুন

সালমান শাহ্ জন্মোৎসব

bnanews24

২০১৮ সালে বিএনপির আয় প্রায় ১০ কোটি

RumoChy Chy

টেকনাফে পৃথক বন্দুকযুদ্ধে নিহত-চার

RumoChy Chy