bnanews24.com

চসিক মেয়র নাছিরের ৩৬ দফার বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি

।।আমিন মুহাম্মদ।।:
২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেগাসিটি ও জলাবদ্ধতা নিরসনসহ ৩৬ দফা স্বপ্ন দেখিয়ে নগরপিতার আসনে বসেছিল আ জ ম নাছির উদ্দীন। এতে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৩৬১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন তিনি। ওই বছরের ৬ মে শপথ নেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২৬ জুলাই। ৬ আগস্ট প্রথম সাধারণ সভা করেন। স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী, কর্পোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর ধরা হয়। ওই হিসেবে আগামী ৬ আগস্ট আ জ ম নাছিরের মেয়াদ শেষ হবে।

বিদায়ী মেয়রের ৩৬ দফা অঙ্গিকারের মধ্যে ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন, সমগ্র নগরীতে ওয়াইফাই জোন, পাহাড় রক্ষা ও বনায়ন, পানি দূষণ রোধ, পানি সংকট নিরসন, কর্ণফুলি নদী রক্ষা করা, শিক্ষার উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, তথ্য প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থীদের বাসভাড়ায় ভর্তুকি, নারীদের জন্য বাস সার্ভিস চালু, আবাসন সংকট নিরসন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ক্রীড়া ও বিনোদন ব্যবস্থার উন্নয়ন, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠন, সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ, গণশৌচাগারের উন্নয়ন, ভিক্ষাবৃত্তি বিমোচন, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ রোধ, আয়বর্ধক প্রকল্প গ্রহণ, শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা, প্রান্তিক মানুষের সুবিধা বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের সংকট নিরসন, ফরমালিনমুক্ত বাজার ব্যবস্থাপনা, আধুনিক কসাইখানা স্থাপন, গরীব মানুষের জন্য বহুতল ফ্ল্যাট, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিক করা, শিশুবান্ধব নগর, ধর্মীয় সুবিধা প্রদান, তরুণ-যুবা-নারী সমাজকে কর্মমুখী করা, কৃষকদের প্রণোদনা প্রদান, ল্যাবরেটরি স্থাপন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা।

যেসব অঙ্গিকার পূরণ হয়নি তার মধ্যে রয়েছে পানি দূষণ রোধ, পানি সংকট নিরসন, নারীদের জন্য বাস সার্ভিস চালু, আবাসন সংকট নিরসন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠন, সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ, ভিক্ষাবৃত্তি বিমোচন, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ রোধ, শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা, প্রান্তিক মানুষের সুবিধা বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের সংকট নিরসন, ফরমালিনমুক্ত বাজার ব্যবস্থাপনা, তরুণ-যুবা-নারী সমাজকে কর্মমুখী করা, কৃষকদের প্রণোদনা প্রদান, ল্যাবরেটরি স্থাপন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থতা, হদিস নেই ওয়াইফাই জোনের, পাহাড় কাটা, কর্ণফুলী নদী রক্ষা, শিক্ষাখাত, স্বাস্থ্য বিভাগ, ভাড়ায় ভর্তুকির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, গরিবের ফ্লাট দখল করে চসিক কার্যালয়, শিশু ও ক্রীড়াবান্ধব নগরী গড়তে ব্যর্থ, তথ্যপ্রযুক্তি স্বনির্ভরতা।

পর্যালোচনায় দেখা ৩৬ দফার মধ্যে বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। তবে, গতানুগতিক কিছু উন্নয়ন হয়েছে। গত পাঁচ বছরে এডিপি খাতে ২ হাজার ৬১২ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় বাস্তবায়ন হয়েছে ৭টি প্রকল্প। জাইকার অর্থায়নে আরো ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ৩টি প্যাকেজে। অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে ২০২ কোটি টাকার নগর ভবন নির্মাণ প্রকল্প এবং ৩২৯ কোটি টাকার স্মার্টসিটি প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্প।

প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এডিপিভুক্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ২৯৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় বাস-ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, ১২০ কোটি টাকায় ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, ৭৫০ কোটি ৫২ লাখ টাকায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাসমূহের উন্নয়ন এবং নালা, প্রতিরোধ দেয়াল, ব্রিজ, কালভার্ট এর নির্মাণ/পুন:নির্মাণ প্রকল্প, ৪২০ কোটি ৮৯ লাখ টাকার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং ব্রিজসমূহের উন্নয়নসহ আধুনিক যান যন্ত্রপাতি ও সড়ক আলোকায়ন প্রকল্প, ২৩১ কোটি টাকায় সেবক কলোনি নির্মাণ প্রকল্প, ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা বহাদ্দারহাট থেকে বারইপাড়া পর্যন্ত নতুন খাল খনন প্রকল্প। এছাড়া ২৬০ কোটি টাকার এলইডি লাইট প্রকল্প দরপত্র আহবান প্রক্রিয়ায় আছে।

৫ বছরে বিএমডিএফ ফান্ডের ১৬০ কোটি টাকার ৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২৩১ কোটি টাকায় সেবক কলোনি নির্মাণ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহায়তায় ৮৮ কোটি টাকায় আধুনিক কসাইখানা নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে ৩ হাজার ১৬৯ কোটি ৯৯ লাখ ৯৩ হাজার টাকায় গৃহীত চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সড়ককে ৪ লেনে উন্নীতকরণসহ শহরের ৬৮৯ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কারের একটি প্রকল্প।

জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৫ সালে দায়িত্ব গ্রহণের চার মাস পর নভেম্বর মাসে চায়নার একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে বৈঠক করেন মেয়র। এরপর ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে তাদের সঙ্গে সমাঝোতা স্মারক সাক্ষরও করে। এর ভিত্তিতে তারা ১১ মাস স্টাডি করে রিপোর্ট দেয় এবং তার আলোকে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পও গ্রহণ করে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অনুমোদন পায় সিডিএ’র প্রকল্প। এরপর প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ ছিল না সিটি কর্পোরেশনের। পরবর্তীতে সিডিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্প গ্রহণ করায় সে দায় থেকে মুক্তি মিলে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের।

বিলবোর্ড উচ্ছেদে সফলতা রয়েছে তার। প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ১৭ বছর এবং এম মনজুর আলম ৫ বছর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। দুই নির্বাচিত মেয়রের ২২ বছরে বিলবোর্ডে ছেয়ে যায় চট্টগ্রাম নগর। পরিবেশ ও নগরবিদদের পাশাপাশি নগরবাসিও এসব বিলবোর্ড অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু বাধা আসে বারবার। ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ ও সিটি করপোরেশন যৌথভাবে বিলবোর্ড অপসারণের কাজ শুরু করেও পিছিয়ে যায়। উচ্ছেদ দলের ওপর হামলা, সড়ক অবরোধ করে বিলবোর্ড অপসারণ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে সমর্থ হয় প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী অনুসারি খ্যাত বিলবোর্ড সিন্ডিকেটটি।

২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন পান আবু জাহেদ মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন প্রকাশ আ জ ম নাছির। তিনি নির্বাচনী ইশতেহারে অঙ্গিকার করেছিল, জয়ী হলে বিলবোর্ড উচ্ছেন করে নগরের সৌন্দর্য ফিরে আনবেন। তিনি কথা রেখেছেন। অনেক বাধা সত্বেও দায়িত্ব নেওয়ার পর বিলবোর্ড অপসারণ কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে অভিযান চালিয়ে ছোটবড় হাজারখানেক অপসারণ করা হয়। মুক্ত হয় চট্টগ্রাম নগরের আকাশ!

ক্লিন সিটি বা পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার সফলতা রয়েছে। এজন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তিনি। প্রদক্ষেপগুলো হচ্ছে- ডোর টু ডোর প্রকল্পের মাধ্যমে বাসা-বাড়ি থেকে সরাসরি ময়লা সংগ্রহ, ডাম্পিং স্টেশন কমিয়ে আনা, দিনের পরিবর্তে রাতের বেলা ময়লা পরিবহন। এছাড়া সরাসরি বাসাবাড়ি থেকে ময়লা-আর্বজনা সংগ্রহে ৯ লাখ ছোট বিন ও ৩ হাজার ৪৩০ টি বড় বিন বিভিন্ন বাসা বাড়ি, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পরবর্তীতে ৩ ধাপে কার্যকর করা হয়েছে ‘ডোর টু ডোর ময়লা অপসারণ কার্যক্রম।’ এছাড়া পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রাম শহরে প্রধান সড়কসহ অলিগলিতে ১ হাজার ৩৯টি ডাম্পিং স্টেশন ছিল চসিকের। বর্তমানে তা কমিয়ে ২৫০টি করা হয়েছে।

সড়ক বাতি স্থাপনেও রয়েছে মেয়রের সাফল্য। ইতোমধ্যে ৮৬ কিলোমিটার সড়কে এলইডি লাইট বাতি লাগানো হয়েছে। চলমান আছে ৭৮ কিলোমিটার সড়কে। ২৬০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটির বিপরীতে ৪১০ কিলোমিটার সড়কের জন্য দরপত্র আহবান করা হচ্ছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সৌন্দর্যবর্ধণ প্রকল্পের আওতায় দেওয়ানহাট ওভার ব্রিজের উভয়পাশের ফুটপাত ও মিড আইল্যান্ড, প্রবর্তক মোড়ে আইয়ুব বাচ্চুর স্মরণে রুপালী গিটার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। আরো ১৯টি সড়ক ঘিরেও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

পৌরকর ইস্যুতেও আলোচনা-সমালোচনা ছিল মেয়রের। ২০১৭ সালের ৩১ আগস্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়। ওইসময় বর্গফুটের ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করে ভাড়ার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার অভিযোগে চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদের ব্যানারে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় এসেসমেন্ট কার্যক্রম স্থগিত করে।

২০১৬ সালের ১০ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে মেয়র ‘ঘুষ না দেয়ায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বরাদ্দ কম পাচ্ছে’ মন্তব্য করে আলোচনায় আসেন। বেশিরভাগ নগরবাসী এর প্রশংসা করেছিলেন।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন দেনা রয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বেশি। ১৯৯৪ সালে প্রথম নির্বাচিত মেয়র হিসেবে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার সময় সিটি করপোরেশনের দেনা ছিল ২৫ কোটি টাকা। তিনি ২০১০ সালে ১৫০ কোটি টাকার দেনা রেখে বিদায় নেন। এরপর সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম ২০১৫ সালের মার্চে দায়িত্ব ছাড়ার সময় করপোরেশনের বকেয়া ছিল ১১৭ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০৭ কোটি টাকায়। এই দেনা রেখে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকে বিদায় নিচ্ছেন আ জ ম নাছির উদ্দীন।

বিএনএনিউজ/এজিএন

আরও পড়ুন

সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবি আটক

Jishan Islam

অনেকদিন ধরে মনে হচ্ছিল বিশ্বকাপ জিতবো : আকরাম খান

showkat osman

ছিনতাই : রিক্সাযাত্রীর প্রাণ গেল সড়কে

bnanews24