bnanews24.com

ইতিহাসের কিংবদন্তি আবুল কালাম আজাদ

 ।। জাকির হোসেন।।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ অনেকটা সুস্থ সবল অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে গেলেও, তিনি বেঁচে আছেন ইতিহাসের কিংবদন্তি হয়ে। বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে, একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষানুরাগী, সমাজ সেবক হিসাবে। ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া এ মানুষটি নিরব শিক্ষা বিপ্লব করে গেছেন। আজীবন করে গেছেন মানবসেবা। ছাগলনাইয়া উপজেলায় উত্তর  যশপুর গ্রামে জন্ম নেয়া এ মানুষটির অভাব কখনো পূরণ হবার নয়। তার শূণ্যতা অনুভব করতে শুরু করেছেন যশপুর রওশন ফকির (র:) মাদ্রাসার শত শত পবিত্র কোরআন হাফেজ শিক্ষার্থীরা। এমন একজন অমায়িক নিরব মানব সেবকের হঠাৎ প্রস্থান মেনে নিতে পারেনি অনেকে।খোদ রওশন ফকির মাদ্রাসা মসজিদের খতিব মওলানা আমির হোসেন চৌধুরী জানাযা নামাজ পড়তে গিয়ে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন।

১৯৯৬ সালে পিতা সুলতান আহমদের মৃত্যুর পর রওশন ফকির (র:) মাদ্রাসা ও মসজিদ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন আবুল কালাম আজাদ। দীর্ঘ ২৫ বছর তিনি পিতার সুযোগ্য সন্তান হিসাবে আমৃত্যু সততা, ন্যায় নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত ২৫ বছরে ওই মাদ্রাসার শত শত কোরআন হাফেজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে  দ্বীনের আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন। মাটি ও মানুষের বন্ধু হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্বাক্ষর রেখেছেন জনসেবায়। মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ প্রজন্মকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, প্রচার না করে কীভাবে নিরবে আত্ম মানবতার সেবা করা যায়।

আবুল কালাম আজাদ কোন বনেয়াদি পরিবারে জন্ম নেননি। কিন্তু চিন্তা চেতনা, মেধা মননে তিনি ছিলেন বনেয়াদি। নির্যাতিত, দুস্থ, অসহায় মানুষের ছিলেন অভিভাবক। ছিলেন নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের সমন্বিত মূল্যবোধের মূখপাত্র। তাইতো ছাত্রজীবনে পাকিস্থানি শাসক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। পিতার উৎসাহে নিজের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়- থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। ২৯টি বাংকার স্থাপন করে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। তারই জের ধরে ১৯৭১ সালের ১৪ আগষ্ট  নিজেদের বসতবাড়িটি পুড়িয়ে দেয় সশস্ত্র রাজাকার-আলবদর বাহিনী। তবুও স্বাধীনতা ও গণ মানুষের  অধিকার আদায়ের সংগ্রাম থেকে পিছু হটেনি। বাড়ির কাছে ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত। স্বপরিবারে সীমান্ত পাড়ি দিলেও  রাতের বেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অপারেশনে অংশ নিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছেন। দেশের নানা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ থাকলেও কখনো গন্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেননি।

১৯৫৪ সালের ২জুন আবুল কালাম আজাদ ছাগলনাইয়া উপজেলার উত্তর যশপুরস্থ হাজী বাড়িতে  জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সুলতান আহমদ। মাতা নূরের নেছা। ১৯৬৯ সালে ফেনী পাইলট স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন আবুল কালাম আজাদ। স্কুল জীবনে একজন ভাল ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। বিভিন্ন স্কুলের সাথে প্রতিযোগিতায় তিনি অংশ নিয়ে বেশ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। উচ্চ শিক্ষার্থে ঢাকায় একটি কলেজে ভর্তি হন। ওই বছরই শুরু হয় ছাত্রদের অসহযোগ আন্দোলন। সেই আন্দোলনের অগ্রনী সৈনিক ছিলেন তিনি। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ১০৫/১০৬ মতিঝিলস্থ মিউচুয়াল ট্রেডিং কোম্পানীতে পার্টটাইম চাকুরি শুরু করেন।

১৯৭১সালে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ছাগলনাইয়ায় গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন এবং  এলাকার যুবকদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।  নিজের বাড়িতে মুক্তি যোদ্ধাদের ঘাঁটি করার সুযোগ করে দেন এবং নানা সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে যান। যা দেশ স্বাধীন না  হওয়া পর্যন্ত চলে।

মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন দৈন্দিন সাংগঠনিক কাজে সম্পৃক্ত হন এবং দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
Image may contain: one or more people, people standing and suit

ছবি: ছোট ভাইদের সঙ্গে আবুল কালাম আজাদকে দেখা যাচ্ছে।(ডান থেকে তৃতীয়)।

আবুল কালাম আজাদ একজন সনদপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও কখনো তা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেননি। গ্রহণ করেননি কোন অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সেই মিউচুয়াল ট্রেডিং কোম্পানীতে পুনরায় যোগ দেন এবং স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন।  ১৯৭৫-১৯৭৭সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের কোরবানিগঞ্জ নূর ম্যানশনস্থ কার্যালয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন। সে সময় কোম্পানীর মিউচুয়াল ট্রেডিং  চট্টগ্রামে বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল। এসব  প্রতিষ্ঠানেরও দেখভালের পাশাপাশি কোম্পানীর ডানো, হলিক্সস বল বেয়ারিং ইন্ডেটিং সংক্রান্ত ব্যবসা তদারকি করতেন।

১৯৭৮ সালে মিউচুয়াল গ্রুপ সিটি গেইট এলাকায়( উত্তর কাট্টলী) একটি মিউচুয়াল জুট স্পিনারস লি. নামে একটি মিল চালু করলে আবুল কালাম আজাদকে ম্যানেজারের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি সেখানে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ২০০৩সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে অবসর গ্রহণ করেন।

 

পরবর্তীতে  সততা, ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা জন্য  অবসর গ্রহণ করার পরও জনাব আবুল কালাম আজাদকে ঢাকায় মিউচুয়াল গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে আরলা ফুডস বাংলাদেশ লি. এর কারখানার দায়িত্ব দেয়া হয়। ২০০৩ সাল থেকে ২০২০ সালের ৪ মে মৃত্যুবরণ করার আগ পর্যন্ত সেখানে জেনারেল ম্যানেজার ( প্রজেক্ট হেড) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

প্রসঙ্গত; আরলা বাংলাদেশের খাদ্যজগতে একটি জনপ্রিয় ব্রান্ড। বিশ্ব বিখ্যাত গুঁড়োদুধ ডানোসহ বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট হিসেবে আরলার জনপ্রিয়তা শীর্ষে।

আবুল কালাম আজাদ দুই সন্তানের জনক। তার বড় ছেলে আরিফ মোর্শেদ আজাদ বুয়েট থেকে বিএসসি(ক্যামিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং), ঢাবি’র আইবিএ থেকে এমবিএ  ডিগ্রী নিয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে ক্যালেফোর্নিয়া সাউদার্ণ বিশ্ববিদ্যালয় হতে পিএইচডি((আইটি)) ডিগ্রী লাভ করেন । বর্তমানে সেখানে একটি ঔষধ কোম্পানির ডিএমডি হিসাবে কর্মরত রয়েছেন।

ছোট ছেলে আসিফ মোরশেদ আজাদ  বিবিএ, এমবিএ পাশ করে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন।

উল্লেখ, গত ২০২০ সালের ৪ জুলাই রাজধানী ঢাকার উত্তরাস্থ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭২ বছর বয়সে আলহাজ্ব আবুল কালাম আজাদ ইন্তেকাল করেন। তিনি পিতা সুলতান আহমেদের ন্যায় নীতি নৈতিকতা ও আর্দশ তথা গণমানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন এবং ওই আর্দশ থেকে বিচ্যূতি হননি। সফল কর্মবীর, শিক্ষানুরাগী, আর্তমানবতার সেবক মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ শুধু ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া  উপজেলায় নয়-সারা দেশের মানুষের কাছে কিংবদন্তি হয়ে রইলেন। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁকে সার্বিক ক্ষমা ও বেহেস্ত নসিব করুন। আমিন।

  • লেখক : প্রকাশক, বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি(বিএনএ)ও পরিচালক (অর্থ), পোর্টল্যন্ড গ্রুপ

আরও পড়ুন

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পর্ব : ২৪০

marjuk munna

হো চি মিন-এ ১৫ বাংলাদেশি আটক

bnanews24

তরুণরাই যেকোন উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি : আইসিটি প্রতিমন্ত্রী

bnanews24