29 C
আবহাওয়া
৭:৫৯ অপরাহ্ণ - আগস্ট ১৮, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » শেখ হাসিনার পতন কি গণ-আন্দোলনে নাকি সেনা অভ্যুত্থানে?

শেখ হাসিনার পতন কি গণ-আন্দোলনে নাকি সেনা অভ্যুত্থানে?


বিএনএ, ঢাকা: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আসল মাস্টারমাইন্ড কারা? ছাত্র-জনতা নাকি পর্দার আড়ালে থাকা অন্য কোনো বড় শক্তি? শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এতদিন পর, হঠাৎ কেন বলা হচ্ছে—ক্যান্টনমেন্টের স্পষ্ট গ্রিন সিগন্যাল বা ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরেই নাকি উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম এক দফার ঘোষণা দিয়েছিলেন? ফেসবুক পোস্টে বিএনপি নেতা রাশেদ খানের এই একটি মন্তব্যই এখন তোলপাড় সৃষ্টি করেছে পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে! তবে কি হাসিনা সরকারের পতন কোনো গণ-আন্দোলন ছিল না, ছিল একটি পরিকল্পিত সেনা অভ্যুত্থান? সাধারণ মানুষের মনে ওঠা এই সব প্রশ্নের পেছনের আসল সত্যটা ঠিক কী?

ঘটনার সূত্রপাত সাবেক গণপরিষদ সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে বিএনপি নেতা রাশেদ খানের সাম্প্রতিক একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। তিনি সরাসরি দাবি করেছেন, ’ক্যান্টনমেন্টের স্পষ্ট ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর নাহিদ ইসলাম এক দফার ঘোষণা করেছিলেন’।

রাশেদ খান তার এই দাবির পক্ষে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলমের একটি বক্তব্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মাহফুজ আলম লিখেছিলেন, ২রা আগস্ট রাতে অনলাইনে ‘এক দফা’ ঘোষণার তীব্র চাপ থাকলেও কৌশলের অংশ হিসেবে তাঁরা সেই রাতে ঘোষণার বিপক্ষে ছিলেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ২রা আগস্ট রাতে অনলাইনে ঘোষণা দেওয়ার চাপ এসেছিল একটি ‘নির্দিষ্ট কোয়ার্টার’ বা মহল থেকে। রাশেদ খানের মতে, এই ‘নির্দিষ্ট কোয়ার্টার’ বলতে মাহফুজ আলম আসলে ক্যান্টনমেন্ট বা সেনাবাহিনীকেই বুঝিয়েছেন!

 

রাশেদ খান এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি কিছু যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক তারিখের হিসাব সামনে এনেছেন। মনে করে দেখুন, ২রা আগস্ট সেনাবাহিনী একটি জরুরি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয় এবং ৩রা আগস্ট সব সিনিয়র অফিসারদের নিয়ে বৈঠক হয়। আর ৩রা আগস্ট দুপুরবেলা তৎকালীন সেনাপ্রধান স্পষ্ট জানিয়ে দেন—সেনাবাহিনী ছাত্র-জনতার বুকে আর গুলি চালাবে না!

রাশেদ খানের ভাষ্যমতে, মূলত পহেলা আগস্টই সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা জনগণের পক্ষে দাঁড়াবে। আর এই কারণেই কার্যত পহেলা আগস্টেই শেখ হাসিনার পতন নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল এবং সেই সিগন্যাল পেয়েই সরকারের এমপি-মন্ত্রীরা দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি বা পালানো শুরু করেছিলেন! তিনি রূপক অর্থে সেনাবাহিনীর এই ঐতিহাসিক অবদানকে বোঝাতে ‘ক্যান্টনমেন্টের ক্লিয়ারেন্স’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যেখানে ছাত্র এবং সেনা—উভয়েরই ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।

রাশেদ খানের এই পোস্টের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি নতুন বিতর্ক ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের একটি অংশ এখন প্রশ্ন তুলছেন—তাহলে কি এই আন্দোলনের মূল ক্রেডিট ছাত্রদের নয়, সেনাবাহিনীর? নেপথ্যে কি আসলে একটি সুক্ষ্ম সেনা অভ্যুত্থান ঘটেছিল?

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতনের জন্য রাজপথে লাখ লাখ মানুষের নেমে আসা এবং শত শত ছাত্র-জনতার বুক পেতে দেওয়াটা ছিল মূল চালিকাশক্তি। সেনাবাহিনী যখন দেখেছে দেশের সাধারণ জনগণ আর এই সরকারকে চায় না এবং জনগণের ওপর গুলি চালানো মানে দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া, তখনই তারা পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার বা জনগণের পক্ষে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ, গণ-আন্দোলনের তীব্রতাই সেনাবাহিনীকে বাধ্য করেছিল সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে। ফলে এটিকে কোনোভাবেই একক ‘সেনা অভ্যুত্থান’ বলা যায় না, বরং এটি ছিল ছাত্র-জনতা ও সেনাবাহিনীর এক অভূতপূর্ব সম্মিলিত ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ!

ইতিহাসের সত্য একেক জনের বয়ানে একেক রকমভাবে উঠে আসছে। মাহফুজ আলমের ‘নির্দিষ্ট কোয়ার্টারের চাপ’ আর রাশেদ খানের ‘ক্যান্টনমেন্টের স্পষ্ট ক্লিয়ারেন্স’—এই দুইয়ের মাঝে লুকিয়ে থাকা আসল সত্যটা হয়তো সময়ের সাথে সাথে আরও পরিষ্কার হবে। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত—জুলাইয়ের সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের যে আত্মত্যাগ, তা কোনো নির্দিষ্ট বাহিনীর বা ব্যক্তির একক কৃতিত্বে সীমাবদ্ধ করা যাবে না।

শামীমা চৌধুরী শাম্মী

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ