15 C
আবহাওয়া
৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ - জানুয়ারি ২০, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » মিশরের ‘ব্রাদার হুড’ পরিণতির আতঙ্কে ‘জামায়াতে ইসলামী’!

মিশরের ‘ব্রাদার হুড’ পরিণতির আতঙ্কে ‘জামায়াতে ইসলামী’!


বিএনএ, ঢাকা : গত ৮ই ডিসেম্বর রাজধানীর গুলশানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘২০০ আসনে এককভাবে বিজয়ী হলেও দেশের স্বার্থ ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে জামায়াত সংসদ নির্বাচনে সব বিজয়ী দলকে নিয়ে জাতীয় সরকারই গঠন করবে। গড়ে তুলবে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ’’।

কেন জামায়াত ইসলামীর আমির ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক শেষে এমন ঘোষণা দেন। সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে, বিশ্লেষণ করতে হবে মিশরের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল ব্রাদার হুড এর ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রেক্ষাপট।
মিশরে হোসনি মুবারকের পতনের পরের রাজনৈতিক পটভূমিতে মুসলিম ব্রাদার হুড এর রাজনৈতিক দল ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। ২০১২ সালের ৩০ জুন মিশরের ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় ২০১৩ সালের ৩রা জুলাই মুসলিম ব্রাদারহুড সরকার তথা প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। বর্তমানে নিষিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে এক সময়কার জনপ্রিয় এই ইসলামিক দল মুসলিম ব্রাদার হুড। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কী সেই আতঙ্কে রয়েছে? সেই কারণে কী অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সরকার গঠন করতে চায় দলটি। এবার আসা যাক সেই বিশ্লেষণে।

মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড এবং বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী উভয়ই ইসলামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলন, যাদের মধ্যে গভীর মতাদর্শগত মিল এবং পারস্পরিক সংযোগ বিদ্যমান। দুটি সংগঠনই হাসান আল-বান্না এবং আবুল আলা মওদুদীর চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত এবং সাংবিধানিক পন্থায় ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী।

১৯২৮ সালে মিশরে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম ব্রাদারহুড বা ইখওয়ানুল মুসলিমিন এবং ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতে প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী (তৎকালীন অবিভক্ত) একে অপরের দ্বারা অনুপ্রাণিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রায়শই জামায়াতকে মুসলিম ব্রাদারহুডের দক্ষিণ এশীয় সংস্করণ হিসেবে দেখেন।

মিশরের ব্রাদার হুড ও বাংলাদেশের জামায়াত ইসলামী উভয় সংগঠনের মূল লক্ষ্য হলো “ইকামতে দ্বীন” বা রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের মাধ্যমে ইসলামী শরিয়াহ আইন ও শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
২০১৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ এবং সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষিত। তাদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চলছে। বর্তমানে মিশরের ভেতরে ব্রাদারহুডের সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রায় নেই বললেই চলে। হাজার হাজার নেতাকর্মী হয় কারাবন্দী, নয়তো দেশের বাইরে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।

জামায়াতে ইসলামী ও ব্রাদার হুড উভয় সংগঠনেরই মূল লক্ষ্য ও মতাদর্শ এক হলেও, মিশরের ব্রাদারহুড প্রায় সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় দমননীতির শিকার হয়ে রাজনৈতিকভাবে বিলীন হওয়ার পথে, যেখানে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী এখনও প্রতিকূলতার মাঝেও একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে আছে এবং ভবিষ্যতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছর শাসনামলে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থা ছিল ব্রাদার হুড এর মতো। ২০২৪ সালের পহেলা আগস্ট তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার নির্বাহী আদেশে জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর দলটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রমে ফিরে আসে এবং প্রকাশ্যে বড় জনসভা ও কর্মী সম্মেলন আয়োজন করে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০২৫ সালে এক রায়ে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ও প্রতীক (দাঁড়িপাল্লা) ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নিবন্ধন পুনর্বহাল করে গেজেট প্রকাশ করে। দলটি গত ১৬ মাসে ব্যাপক সাংগঠনিক দক্ষতা ও গণভিত্তি অর্জন করেছে। ফলে দলটি বিএনপিকে পিছনে ফেলে ক্ষমতাসীন হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের আছে নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক, তবে এককভাবে সরকার গঠন করার মতো ব্যাপক জনসমর্থন নেই। এককভাবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা ৪.২৮% ভোট পেয়েছিল।এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দলটির জনসমর্থন ১০- ১২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাদের ক্ষমতায় যেতে হলে অন্যান্য দলের সাথে কার্যকর জোট গঠন করা অপরিহার্য। তারই ধরাবাহিকতায় জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে আটটি সমমনা ইসলামপন্থী দল নিয়ে একটি নতুন জোট গঠন করেছে। তারা এই জোটের অধীনে একক প্রার্থী দেওয়ার জন্য আলোচনা শুরু করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের একটি সুসংগঠিত সাংগঠনিক কাঠামো এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি রয়েছে, যা তাদের নির্বাচনী কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধানত দুটি বড় দল—আওয়ামী লীগ (বর্তমানে তাদের কার্যক্রম স্থগিত) এবং বিএনপি—নিয়ন্ত্রক শক্তি। এই দলগুলোর শক্তিশালী জনভিত্তির বিপরীতে জামায়াতের জন্য এককভাবে ক্ষমতায় আসা অত্যন্ত কঠিন। যদিও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জামায়াত স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রমে ফিরেছে, তবে তাদের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।

বিশেষ করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ —জামায়াতের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বাধা। অনেক রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তাদের রাজনীতি করার অধিকার নিয়ে এখনো প্রশ্ন তোলা হয়।

প্রসঙ্গত, মিশরের ব্রাদারহুড বর্তমানে প্রায় নির্মূল হওয়ার পথে । যেখানে বাংলাদেশের জামায়াত তীব্র চাপের মুখেও এখনো সাংগঠনিক কাঠামো ধরে রেখেছে এবং রাজনীতিতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। মিশরের ঘটনাপ্রবাহ জামায়াতের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে দুই দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ভিন্ন হওয়ায় হুবহু একই পরিণতি হবে কিনা তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রতা ভেঙে যাওয়ায় আসন্ন নির্বাচনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অভিন্ন শত্রু না থাকায় দুই দলের মধ্যে বিভেদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে দল দুটি একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থানে রয়েছে এবং তিক্ততা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, বিএনপি ও জামায়াতের এই তীব্র বিরোধ আসন্ন নির্বাচনকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
অতীতে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করায় বিএনপি ও জামায়াত একে অপরের ভোটব্যাংক থেকে সুবিধা পেত। কিন্তু এখন তারা আলাদাভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে ইসলামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী ঘরানার ভোট ভাগ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে অনেক আসনে দুই দলের প্রার্থীর জন্যই জয়লাভ কঠিন করে তুলতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের আমল জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বর্ণযুগ। বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াত বাংলাদেশের দলটি গত ১৬ মাসে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় বেশ গভীরে প্রবেশ করেছে এবং ক্ষমতার বাইরে থেকেও তারা ক্ষমতার প্রভাবক হিসাবে কাজ করছে, চাপ সৃষ্টি করে বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা নিচ্ছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ ও সচিবালয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় রয়েছে।

জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে “কট্টর ইসলামপন্থী” এবং “সংখ্যালঘু বিরোধী” হিসেবে পরিচিত। এই প্রার্থীর মাধ্যমে দলটি নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তন করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক (inclusive) এবং অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে পরিচিতি অর্জনের চেষ্টা করছে। কোরআন ও সুন্নাহ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাজনৈতিক মাঠে আসা জামায়াত ইসলামী নির্বাচনী কৌশল হিসাবে খুলনা-১ সংসদীয় আসনে ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতের হিন্দু শাখার সভাপতি কৃষ্ণ নন্দীকে মনোনয়ন দিয়েছে। জামায়াতের নেতারা এই পদক্ষেপকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন
অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি জামায়াতের একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। খুলনা-১ আসনটি মূলত হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট টানতে এবং নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু মন্তব্যকারী এই বিষয়টিকে ভারতের “এজেন্ডা বাস্তবায়ন” বা “ভারতকে খুশি করার” চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে আলোচিত সমালোচিত জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে গত ১৮ই সেপ্টেম্বের একট বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম ‘এই সময়’। ভারতীয় সাংবাদিক অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিশেষ প্রতিবেদন ‘পূর্বের হাওয়া: পর্ব ৩— ইসলামি জোট গড়ে জয়ী হতে কি পারবে জামায়াত’ শিরোনামে প্রকাশিত ও প্রতিবেদনে বাংলাদেশে কাজ করা এক মার্কিন কনস্যুলেট দলটির জনপ্রিয়তার অন্তত: ৫টি কারণ উল্লেখ করেন।

সংবাদমাধ্যমটি ওই কূটনীতিকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী কেন এত প্রিয় আপনাদের কাছে? জবাবে তিনি বলেছেন জামায়াত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে। তাদের নেতারা উচ্চশিক্ষিত। বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত সফল। তাদের আচরণ খুব ভদ্র-সভ্য। মায়াত তালেবানের মতো পিছিয়ে পড়া নয়, বরং প্রগতিশীলই বলা যায়।
তবে সংবাদমাধ্যমটি ওই কূটনীতিকের নাম উল্লেখ করেনি। সেই মার্কিন কূটনীতিক বলেন, ‘যে দেশের ৮০-৮৫ শতাংশ মানুষ মুসলমান, সেখানে জামায়াত যদি সরকারে আসে ক্ষতি কী? তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ দল। তাদেরও উচিত এক বার সুযোগ পাওয়া। কী আছে, ফেল করলে মানুষ সরিয়ে দেবেন!
যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশে শাসন ক্ষমতায় আসুক জামায়াত। অনেক দশক ধরেই তাদের এই চাওয়া। এ নিয়ে তাদের লুকোছাপা বিশেষ নেই বলে মন্তব্য করেন ভারতীয় গণমাধ্যম ‘এই সময়’কে দেয়া বাংলাদেশে কাজ করা মার্কিন কূটনীতিক।

বিএনএনিউজ/ সৈয়দ সাকিব/এইচ.এম।

Loading


শিরোনাম বিএনএ