16 C
আবহাওয়া
৬:০৬ পূর্বাহ্ণ - জানুয়ারি ১৪, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » কেমন হবে বিএনপির সরোয়ার, জামায়াতের নুরুল আমিনের লড়াই?

কেমন হবে বিএনপির সরোয়ার, জামায়াতের নুরুল আমিনের লড়াই?


বিএনএ, ঢাকা : ফটিকছড়ি। এটি চট্টগ্রাম জেলার বৃহত্তম উপজেলা, যার আয়তন ৭৭৩.৫৫ বর্গ কিলোমিটার। এই উপজেলার উত্তর দিকে ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত অবস্থিত। ফটিকছড়িকে বাংলাদেশের চায়ের রাজধানীও বলা হয়। দেশের ১৬৩টি চা বাগানের মধ্যে ১৭টি চা বাগান এখানেই অবস্থিত। ফটিকছড়িতে রয়েছে আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বখ্যাত মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ ।
চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় এলাকার মধ্যে ফটিকছড়ি এবং ভুজপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটি সবচেয়ে বড়। এটি জাতীয় সংসদের ২৭৯ তম আসন। ২০০১ সাল পর্যন্ত এই আসনটি চট্টগ্রাম-৪ নামে পরিচিত ছিল। ২০০৮ সালে সীমানা পরিবর্তন হওয়ার পর থেকে আসনটি নাম পরিবর্তন করে চট্টগ্রাম-২ নামে পরিচয় বহন করছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ৫জন প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন। এর মধ্যে বিএনপির সরোয়ার আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নুরুল আমিনের মধ্যে সরাসরি লড়াই হবে। আওয়ামী লীগ বিহীন এই নির্বাচনে কেমন হবে এই দুইজনের ভোটের লড়াই? সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন, জেনে নেই, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৫১ হাজার ১ শত ৯৫ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৯ হাজার ৭ শত ৯০ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৫১ হাজার ৬ শত ৭৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক, অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন ডাক্তার নুরুচ্ছাপা । ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৪৫ হাজার ৮ শত ৯৪ ভোট ।

১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৩ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯ শত ৫৪ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের রফিকুল আনোয়ার বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৭২ হাজার ৫ শত ৪৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির জামাল উদ্দীন আহমেদ। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৫৫ হাজার ৭ শত ৩ ভোট।

২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৭৬ হাজার ৭ শত ৯১ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯৫ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের রফিকুল আনোয়ার বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৮ হাজার ১১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৮২ হাজার ৫ শত ১৮ ভোট।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৮০ হাজার ১ শত ৪৬ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ২৪ হাজার ৫৬ জন। নির্বাচনে বিএনপির সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ২৯ হাজার ৩ শত ৩৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের এটিএম পিয়ারুল ইসলাম। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৯২ হাজার ২ শত ৬৬ ভোট।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম-২ সংসদীয় আসনে পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম সংসদে আওয়ামী লীগ, নবম সংসদে বিএনপি বিজয়ী হয়।

এবার আসা যাক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২( ফটিকছড়ি-ভুজপুর)আসনে রাজনৈতিক দলগুলো কত শতাংশ ভোট পেয়েছিল সেই বিশ্লেষণে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-২ সংসদীয় আসনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৪৩.৭১% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪৭.০৭%, বিএনপি ৪১.৮০%, জাতীয় পার্টি ২.০২%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ৯.১১% ভোট পায়।

১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭০.০১% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৫২.৫৯%, বিএনপি ৪০.৩৮%, জাতীয় পার্টি ০.২৫%, জামায়াত ইসলামী ৬.১৮% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৬০% ভোট পায়।

২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬৯.৭৬% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৫৫.৯৪%, ৪ দলীয় জোট ৪২.৭৩%, জাতীয় পার্টি ০.৪৬% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৮৭% ভোট পায়।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৯.৯৮% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ১৪ দলীয় জোট ৪১.১৮%, ৪ দলীয় জোট ৫৭.৭২%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ১.১০% ভোট পায়।

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে র্নিবাচনের দাবিতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেনি। নির্বাচনে তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৪ শত ৮৫ জন। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ৭ জন। নৌকা প্রতীকে তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির মোঃ আজিম উল্লাহ বাহার, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির জহরুল ইসলাম রেজা, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ আতিক, আপেল প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী এটিএম পেয়ারুল ইসলাম, চেয়ার প্রতীকে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মীর মোহাম্মদ ফেরদৌস আলম এবং মোমবাতি প্রতীকে ইসলামি ফ্রন্ট এর শাহজাদা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমেদ প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।

কিন্তু ভোটের আগের দিন রাতে প্রশাসনের সহযোগীতায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে ব্যালেট বাক্স ভর্তি করে রাখা হয়। রাতের ভোট খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মহাজোট মনোনীত প্রার্থী তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখান করে।
২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি- জামায়াত ইসলামীসহ তাদের সমমনা দল গুলো নির্বাচন বর্জন করে। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন মাইজভান্ডারি, আওয়ামী লীগের খাদিজাতুল আনোয়ার সনি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু তৈয়ব প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ভোটারদের বড় অংশ ভোট কেন্দ্রে যায়নি। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের খাদিজাতুল আনোয়ার সনিকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি-ভুজপুর) আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া ৯ প্রার্থীর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে পাঁচজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এরা হলেন- বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম মহানগরীর সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নুরুল আমিন, জনতার দলের মোহাম্মদ গোলাম নওশের আলী, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির শাহজাদা সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ মাইজভান্ডারী এবং একই দলের মো. ওসমান আলী। তবে মুল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম মহানগরীর সেক্রেটারি ও মজলিশে সুরা সদস্য অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নুরুল আমিন দুইজনই প্রথমবারের মত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তৃণমূল পর্যায়ে দুইজনই রাজনৈতিক পরিমন্ডলে অপরিচিত। নিজ নিজ দলীয় ভোট ব্যাংকই তাদের শক্তি। বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির শাহজাদা সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ মাইজভান্ডারী দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মাইজভান্ডার শরীফের খাদেম হিসাবে এলাকার মানুষ চিনলেও তার দল ও প্রতীক একতারাকে মানুষ চিনে না। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে সুপ্রিম পার্টিকে নিবন্ধন দেওয়া হয়। ওই নির্বাচনে সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ জামানত হারিয়েছিলেন। তার প্রাপ্ত ভোট মাত্র ৩ হাজার ১৫১। এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আলোচনায় নেই বাংলাদেশসুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান।
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি-ভুজপুর) আসনটি বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত। এছাড়া ভোট ব্যাংক রয়েছে হেফাজতে ইসলামীর। যা বিএনপির বাক্সকে পূর্ণ করবে। সেই দিক থেকে নির্ভার রয়েছে বিএনপি।

আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না থাকলেও তাদের প্রচুর ভোট রয়েছে। আওয়ামী লীগের ভোটাররা জয়-পরাজয়ের একটি বড় ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করবে। কিন্তু দলটির বেশিরভাগ ভোটার কেন্দ্রমূখী না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই ক্ষেত্রে নিজস্ব বিশাল ভোট ব্যাংক ও হেফাজত ইসলামীর ভোট নিয়ে খুব সহজে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি-ভুজপুর) আসনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, এমনটাই মনে করছেন দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পরিচালিত বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোরের জরিপে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ ভোটার।

বিএনএনিউজ/শামীমা চৌধুরী শাম্মী/এইচ.এম।

Loading


শিরোনাম বিএনএ