বিএনএ, ঢাকা : রাজশাহী জেলার পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র ভূমিতে অবস্থিত গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলা। এ দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-১ আসন। এটি জাতীয় সংসদের ৫২ নাম্বার আসন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন জামায়াত ইসলমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তার সঙ্গে সরাসরি লড়াই হবে বিএনপির চেয়ারপাসনের উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল শরিফ উদ্দিনের। তিনি তিনবারের সাবেক এমপি ও মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ছোট ভাই। নির্বাচনী লড়াইয়ে নবাগত বিএনপির চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক সামরিক সচিবকে লড়াই করতে হবে রাজনীতিতে প্রবীন জামায়াত ইসলামীর সিনিয়র নায়েবে আমীর মুজিবুর রহমানের সঙ্গে।

কেমন হবে রাজশাহী-১ গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসনে জামায়াত- বিএনপির ভোটের লড়াই। তত্ত্বাধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল, মাঠ পর্যায়ের জরিপ ও বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে রাজশাহীর ভিআইপি আসন খ্যাত গোদাগাড়ী-তানোর আসনের নির্বাচনী হালচালের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে। এবার যাওয়া যাক, সেই বিশ্লেষণে।
১৯৯১ সালের ২৭ই ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। রাজশাহী-১ আসনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৯৪ হাজার ২ শত ৩৩ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ১ শত ০২ জন। নির্বাচনে বিএনপির ব্যারিস্টার আমিনুল হক বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৬১ হাজার ৯ শত ৭৫ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ মহসিন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৪২ হাজার ৮ শত ৯৭ ভোট। জামায়াত ইসলামীর বর্তমান প্রার্থী মুজিবুর রহমান ওই নির্বাচনে তৃতীয় হন। দাঁড়িপালা প্রতীকে তিনি পান ৩০ হাজার ৫৮ ভোট।
১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ট জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির শাসনামলে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপি, ফ্রিডম পার্টি এবং কিছু নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল, অখ্যাত ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। এতে বিএনপির ব্যারিস্টার আমিনুল হককে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগসহ সব বিরোধী দল এই নির্বাচন বর্জন করে। এই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১১ দিন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ হওয়ার পর সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ২০ হাজার ৯৬ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ১ শত ২ জন। নির্বাচনে বিএনপির ব্যারিস্টার আমিনুল হক বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৮৩ হাজার ৯ শত ৯৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের আলাল উদ্দিন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৫৫ হাজার ৩ ভোট। জামায়াত ইসলামী প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান দ্বিতীয়বার তৃতীয় হন।দাড়ি পালা প্রতীকে তিনি পান ২৮ হাজার ৪ শত ৫৩ ভোট। ৫ বছরের ব্যবধানে তার ভোট কমেছে প্রায় ১ হাজার ৬ শত ৫ ভাট।
২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৪৯ হাজার ৫ শত ৩৩ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ২১ হাজার ১ শত ৩৯ জন। নির্বাচনে বিএনপির ব্যারিস্টার আমিনুল হক বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৩০ হাজার ৬ শত ৩১ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের ওমর ফারুক চৌধুরী। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৮৪ হাজার ১ শত ৮৫ ভোট। জামায়াত ইসলামী ৪ দলীয় জোটের অংশিদার হওয়ায় এই আসনে প্রাথী দেয়নি।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৯৭ হাজার ৩ শত ৩৮ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ৭৯ হাজার ৯শত ৪৪ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ওমর ফারুক চৌধুরী বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭ শত ৮৬ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির ব্যারিস্টার এনামুল হক। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ২৯ হাজার ৪ শত ৫০ ভোট। এবারও জামায়াত ইসলামী জোটের শরিক বিএনপিকে সমর্থন দেয়।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ওমর ফারুক চৌধুরী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় বিজয়ী হন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৩ শত ৫২ জন। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন৪ জন। নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের ওমর ফারুক চৌধুরী, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির ব্যারিস্টার আমিনুল হক। হাত পাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুল মান্নান, মই প্রতীকে বাসদের আফজাল হোসেন প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।
কিন্তু নির্বাচনের আগের রাতেই প্রশাসনের যোগসাজসে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মার্কা নৌকায় সিল দিয়ে ব্যালট বক্স ভর্তি করে রাখা হয়। ফলে কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখান করে।
২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি- জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে নির্বাচন বর্জন করে। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট ওমর ফারুর চৌধুরীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনে গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী- ১ আসনে পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, বিজয়ী হয়। নবম সংসদে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। জামায়াত ইসলামী ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে প্রার্থী দিয়ে তৃতীয় হয়। ২০০১ ও ২০০৮ সালে প্রার্থী না দিয়ে বিএনপিকে সমর্থন দেয়
দীর্ঘ ১৭বছর পর আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই আসনটি এবার জামায়াত ইসলামী দলের সিনিয়র নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের মাধ্যমে দখল করতে চায়। এই জন্য দলটি তৃণমূল পর্যায়ে প্রচারাভিযান চালাচ্ছে। একই সঙ্গে পি-আর পদ্ধতির নির্বাচনে দাবিও জানাচ্ছে। পিআর পদ্ধতির এক কর্মশালায় কালো টাকা, হোন্ডা-গুন্ডার নির্বাচনে কুফল তুলে ধরেন জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।
বিএনপি চায় দলটি সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এনামুল হকের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তার ভাই বিএনপির চেয়ারপাসনের উপদেষ্টা সাবেক সামরিক সচিব জেনারেল শরিফ উদ্দিনের মাধ্যমে আসনটি পূণরুদ্ধার করতে। বিএনপি প্রার্থী শরিফ উদ্দিন তার ভাইয়ের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারাভিযানে নেমেছেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনএ নিউজ টুয়েন্টি ফোর এর গবেষণা টিম দৈবচয়ন পদ্ধতিতে সারাদেশে জরিপ চালায়। জরিপে অংশগ্রহণকারি বেশীরভাগ ভোটার ১৯৯১ সালের পঞ্চম, ১৯৯৬ সালের সপ্তম, ২০০১ সালের অষ্টম ও ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরেপক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। তারই ভিত্তিতে বিএনএ নিউজ টুয়েন্টি ফোর রাজশাহী-১ আসনে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম ও নবম এই ৪টি নির্বাচনের প্রদত্ত ভোটের পরিসংখ্যানকে মানদন্ড ধরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক শক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি কল্পানুমান উপস্থাপনের চেষ্ঠা করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৪. ৩৩% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৯.৭১%, বিএনপি ৪২.৯২%, জাতীয় পার্টি ১.৪৬%, জাময়াত ইসলামী ২৬.৩৬ স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৪৫% ভোট পায়।
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৮৭.১৪%। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩১.২৩%, বিএনপি ৪৭.৭০%, জামায়াত ইসলামী ১৬.১৬%, জাতীয় পাটি ৩.৯৩% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.১৮% ভোট পায়।
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৮৮.৬২% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৮.০৭%, ৪দলীয় জোট ৫৯.০৭%, জাতীয় পার্টি ২.২৭%,স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৫৯% ভোট পায়।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৯৩.৪১% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ১৪ দলীয় জোট ৫২.৮৫%, ৪ দলীয় জোট ৪৬.৬১%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দল ০.৫৪% ভোট পায়।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী- ১ আসনটি বিএনপির দূর্গ। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রথমবারের মতো বিএনপির এই দূর্গে আঘাত হানে। তারপর থেকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সরকার পরিবর্তনের আগ পর্যন্ত সাংগঠনিক বিস্তার বাড়িয়েছে আওয়ামী লীগ।কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
সরকারের নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। নিবন্ধন স্থগিত। সাবেক সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী হত্যা প্রচেষ্টা ও ভোটকেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মারার অভিযোগে দুটি মামলা হয়েছে। তিনিসহ বেশিরভাগ নেতাকর্মী পলাতক রয়েছেন। ফলে এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি ভোট যুদ্ধ হবে। তবে জয়– পরাজয় নির্ভর করছে আওয়ামী লীগের ভোটার ও হিন্দু ভোট ব্যাংকের ওপর। সর্বশেষ তথ্য উপাত্ত ও মাঠ পর্যায়ে পরিচালিত জরিপে জয়ের পাল্লা বিএনপি প্রার্থীর দিকেই ভারি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হলে জাতীয় সংসদের ৫২ নম্বর রাজশাহী-১ আসনে এবার বিএনপি বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী বলে মনে করেন এলাকার ভোটারা।
তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ ভিন্ন মত পোষন করে বলছেন, আপাত দৃষ্টিতে জামায়াত ইসলামী ও বিএনপির মধ্যে ভোটের মাঠে বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে থাকলে তানোর বা গোদাগাড়ি উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান অথবা চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন এমন কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে সনাতন হিন্দু অধ্যুষিত এই আসনের সব হিসেব নিকাশ উল্টে যেতে পারে!
বিএনএনিউজ/ সৈয়দ সাকিব/এইচ.এম।
![]()
