বিএনএ, ঢাকা : চট্টগ্রাম। বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার, দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর, বাণিজ্যিক রাজধানী এবং একমাত্র দ্বিমাত্রিক শহর। পাহাড়, সমুদ্র এবং উপত্যকায় ঘেরা চট্টগ্রাম শহর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে প্রাচ্যের রাণী হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রামে রয়েছে ১৬ টি সংসদীয় এলাকা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) অন্যতম।
মিরসরাইয়ের উত্তরে ফেনী জেলার সোনাগাজী, ফেনী সদর ও ছাগলনাইয়া উপজেলা, উত্তর-পূর্বে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলা, দক্ষিণে সীতাকুন্ড এবং পশ্চিমে সন্দ্বীপ । পূর্বে পাহাড় আর পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর মিলেই মিরসরাই। প্রকৃতির নিদারুণ বুনো ঝরনা আর পাহাড়ি ঝিরিপথের এ অঞ্চলে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ বঙ্গবন্ধু শিল্প নগর মিরসরাই ১ সংসদীয় আসনটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।
চট্টগ্রাম-১ সংসদীয় আসনটি মিরসরাই উপজেলা নিয়ে গঠিত। এটি জাতীয় সংসদের ২৭৮ তম আসন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসনে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগ ছাড়াই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ভোটের লড়াই হতে যাচ্ছে। বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল আমিন। তার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা অ্যাডভোকেট ছাইফুর রহমান। কেমন হবে এই দুই জনের ভোটের লড়াই? সে বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন জেনে নেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল।
১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই আসনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ১৩ হাজার ৩২ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ২৭ হাজার ৮ শত ১০ জন। নির্বাচনে বিএনপির মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৬৬ হাজার ৯ শত ৬৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৪৮ হাজার ৩০ ভোট ।
১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৩ শত ৪৩ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭ শত ২ জন। নির্বাচনে বিএনপির বেগম খালেদা জিয়া বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৬৬ হাজার ৩ শত ৩৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৬২ হাজার ৪৩ ভোট।
প্রসঙ্গত বেগম খালেদা জিয়া ৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৫টিতেই বিজয়ী হন। তিনি ফেনী-১ আসনকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য বেছে নেন এবং বাকী ৪ টি আসন ছেড়ে দেন। ছেড়ে দেওয়া আসনের মধ্যে মিরসরাই একটি। ফলে পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত উপ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বিজয়ী হন।
২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ২৪ হাজার ৮ শত ৩৬ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৩ শত ৫১ জন। নির্বাচনে বিএনপির মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৮৬ হাজার ৮ শত ৩৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৮২ হাজার ৩ শত ৩৩ ভোট।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৩৫ হাজার ২ শত ৭০ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ১ হাজার ৪ শত ২৬ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৫ হাজার ৩ শত ৩৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির কামাল উদ্দীন চৌধুরী। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৯৪ হাজার ৬ শত ৬৫ ভোট।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম সংসদে বিএনপি এবং সপ্তম সংসদের উপনির্বাচন ও নবম সংসদে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়।
এবার আসা যাক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে রাজনৈতিক দলগুলো কত শতাংশ ভোট পেয়েছিল সেই বিশ্লেষণে।
নির্বাচন কমিশন থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-১ সংসদীয় আসনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬০.০০% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৭.৫৮%, বিএনপি ৫২.৪০%, জামায়াত ইসলামী ৮.৩০% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ১.৭২% ভোট পায়।
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৮.৫৩% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪৫.০৬%, বিএনপি ৪৮.১৭%, জাতীয় পার্টি ১.৭৩%, জামায়াত ইসলামী ৪.৪৩% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৬১% ভোট পায়।
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৬.২১% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪৮.০৫%, ৪ দলীয় জোট ৫০.৬৮%, জাতীয় পার্টি ০.৫৪% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৭৩% ভোট পায়।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৮৫.৬১% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ১৪ দলীয় জোট ৫২.৩০%, ৪ দলীয় জোট ৪৭.০০%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৭০% ভোট পায়।
চলুন দেখে আসি, আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেমন ছিল? কে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন?
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে র্নিবাচনের দাবিতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন।
২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৬ জন। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ৬ জন। নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির নুরুল আমিন, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোঃ শামছুদ্দিন, উদীয়মান সূর্য প্রতীকে গনফোরামের নুর উদ্দীন আহমদ, চেয়ার প্রতীকে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের আব্দুল মান্নান এবং পাঞ্জা প্রতীকে মুসলীম লীগ- বি এম এল এর শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।
কিন্তু ভোটের আগের দিন রাতে প্রশাসনের সহযোগীতায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকরা নৌকা প্রতীকে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখে। নৈশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। কারচুপির অভিযোগে বিএনপির নেতৃতাধীন জাতীয় ঐক্যজাট এই সংসদ নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে।
২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি- জামায়াত ইসলামীসহ তাদের সমমনা দল গুলো নির্বাচন বর্জন করে। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। যদিও ভোটারদের বড় অংশ ভোট কেন্দ্রে যায়নি। আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার প্রার্থী মোশাররফ হোসেন ছেলে মাহবুব রহমান রুহেলকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু নির্বাচনের ৮ মাসের মাথায় ২০২৪ সালের ৫ই আগষ্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যূত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। পরদিন রাষ্ট্রপতি এই সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। ৮ই আগষ্ট ক্ষমতাসীন হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মিরসরাই উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল আমিন। জামায়াতে ইসলামী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন অ্যাডভোকেট ছাইফুর রহমান। তিনি হাইকোর্টের সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নী জেনারেল।
আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ,জাতীয় পার্টির সৈয়দ শাহাদাৎ হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ফেরদৌস আহম্মদ চৌধুরী,মুসলিম লীগের শেখ জুলফিকার বুলবুল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি)র এ. কে. এম আবু ইউছুপ, ইনসানিয়াত বিপ্লবের রেজাউল করিম । এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিবেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী। তবে ভোটের মাঠে সক্রিয় আছে শুধু বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী।
তথ্য- উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই আসনটি একক কোন রাজনৈতিক দলের ঘাটি নয়। ভোটের হিসাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখানে সমানে-সমান। অতীতে অংশগ্রহণমূলক প্রতিটি নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে অল্প ভোটের ব্যবধানে। কিন্তু এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
দলীয় প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগের ভোটারদের বড় একটি অংশ ভোট প্রদানে বিরত থাকার সম্ভাবনা বেশি। এই আসনে প্রচুর সংখ্যালঘু হিন্দু ভোটার রয়েছে। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তারা জয়-পরাজয়ে ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে এসেছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তারা ভোট কেন্দ্রে যাচ্ছে না এটা এক প্রকার নিশ্চিত।
সেই ক্ষেত্রে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। জামায়াতে ইসলামী এই আসনে কখনো বিজয়ী হতে পারেনি। এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও ছিল না। তবে দলটির রয়েছে ভোট ব্যাংক। বিএনপির প্রচুর ভোট থাকলেও অন্তকোন্দল প্রকট। এতে বাড়তি সুবিধা পাবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। নির্বাচনে বিএনপি দলীয় কোন্দল মিটিয়ে একমঞ্চে আসতে না পারলে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট ছাইফুর রহমানের গলায় বিজয়ের মালা দেখা যাবে এমনটাই মনে করেন দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পরিচালিত বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোরের জরিপে অংশ নেয়া বেশিরভাগ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গণ।
বিএনএনিউজ/ শামীমা চৌধুরী শাম্মী/ এইচ.এম।
![]()
