বিএনএ, ঢাকা : ঢাকা-৮ সংসদীয় আসনটি (রমনা-মতিঝিল-পল্টন) নিয়ে গঠিত, জাতীয় সংসদের ১৮১তম আসন। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঢাকা-৮ আসনটিতে রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবভন, সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালত এবং বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল রয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে এই আসনের সীমানা পরিবর্তন হয়। তার আগে এই আসনটি ঢাকা-৬ নামে পরিচিত ছিল।
ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে এই আসনটি আলোচনার তুঙ্গে। এর অন্যতম কারণ এই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদী আততায়ীর গুলিতে খুন হয়েছেন। এই খুনের জন্য জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির বিএনপির’র স্থায়ী কমিটির মির্জা আব্বাসের দিকে আঙ্গুল তুলেছেন। যদিও এই ব্যাপারে কোন দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির(এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এক সময় স্যালুট সুজন নামে একজন রিকশাওয়ালাকে প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তাকে বাদ দিয়ে এই আসনে প্রার্থী হয়েছেন নাসীরুদ্দিন পাটোয়ারি।
সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটে যোগ দিয়েছেন এনসিপি। জোটের প্রার্থী হিসাবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।তিনি দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির। এই অবস্থায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাসের সঙে রাজনীতিতে নবাগত এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গে সরাসরি ভোটের লড়াই হবে। এছাড়া এই আসনে গণ পরিষদের থেকে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন আলোচিত-সমালোচিত মডেল, মিস বাংলাদেশ ২০০০ মেঘনা আলম। কেমন হবে প্রবীন মির্জা আব্বাস, নবীন নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারি ও মডেল মেঘনা আলমের লড়াই? সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন জেনে নেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল।
১৯৯১ সালের ২৭ই ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই আসনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ১৩ হাজার ৯ শত ৯৩ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৯ হাজার ৭৪ জন। নির্বাচনে বিএনপির মীর্জা আব্বাস বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৫৯ হাজার ৬৮ শত ৫১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের মোজাফফর হোসেন নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৩৪ হাজার ১ শত ১ ভোট। জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী ছিলেন আব্দুস সালাম। দাড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পান ১০ হাজর ১ শত ১৪ ভোট।
১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৪ শত ৯ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ৩১ হাজার ৩ শত ১৭ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাবের হোসেন চৌধুরী বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৪ হাজার ৬ শত ৯৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি মীর্জা আব্বাস। ধানের শীর্ষের প্রতীকে তিনি পান ৯৫ হাজার ৬ শত ৭৩ ভোট। জামায়াত ইসলামীর আব্দুস সালাম দাড়িপাল্লা পান ৬ হাজার ৯ শত ৭৭ ভোট।
২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৬ শত ১৬ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ৮২ হাজার ৩ শত ৫৪ জন। নির্বাচনে বিএনপির মির্জা আব্বাস বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩ শত ৫৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবের হোসেন চৌধুরী। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ১৬ হাজার ৯ শত ৭৬ ভোট। জামায়াত ইসলামী ৪ দলীয় জোট সঙ্গী হিসাবে এই আসনে কোন প্রার্থী দেননি। বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে সমর্থন দেয়।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ২৪ হাজার ৬ শত ৫০ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৭০ হাজার ৬০ জন। নির্বাচনে ওয়ার্কাস পার্টির রাশেদ খান মেনন বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি ৯৭ হাজার ৮ শত ৪১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির হাবিব-উন নবী খান সোহেল। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৬৩ হাজার ২ শত ৭৩ ভোট।
প্রসঙ্গত, এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দুর্নীতির মামলা থাকায় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছিলেন মির্জা আব্বাস। জাতীয় পার্টি ও জামায়াত ইসলামী প্রার্থী দেয়নি। জাতীয় পার্টি মহাজোটের প্রাথী আওয়ামীলীগকে, জামায়াত ইসলামী ৪দীয় জোট সঙ্গী হিসাবে বিএনপিকে সমর্থন দেয়।
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম, অষ্টম সংসদে বিএনপি, সপ্তম সংসদে আওয়ামী লীগ এবং নবম সংসদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ওয়ার্কাস পার্টি বিজয়ী হয়।
এবার আসা যাক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনে ঢাকা- ৮ সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক দলগুলো কত শতাংশ ভোট পেয়েছিল সেই বিশ্লেষণে।
ঢাকা-৮ সংসদীয় আসনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৫০.৯৭% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩১.২৬%, বিএনপি ৫৪.৮৭%, জাতীয় পাটি ১.৮৮% জামায়াত ৯.২৬ %স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ৫.৭৩%ভোট পায়।
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬৬.৯৭% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪৫.২৬%, বিএনপি ৪১.৩৬% জাতীয় পাটি ৮.১৩%,জামায়াত ইসলামী ৩.০২% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ২.২৩ %ভোট পায়।
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬০.১২% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪১.৪৩%, ৪ দলীয় জোট ৫৫.৩৮%, জাতীয় পার্টি ২.৫০% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৬৯% ভোট পায়।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৫.৫৪% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ১৪ দলীয় জোট ৫৭.৬৫%, ৪ দলীয় জোট ৩৭.৬৩% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ৪.৭২% ভোট পায়।
এবার আসা যাক, আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেমন ছিল? কে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন?
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে র্নিবাচনের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনে ওয়ার্কাস পার্টির রাশেদ মেননকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৬৪ হাজার ৮ শত ৬৪ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৮২ হাজার ৯ শত ৫৯ জন। নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ১৪ দলীয় জোটের ওয়ার্কাস পার্টির রাশেদ খান মেনন, ধানের শীষ প্রতীকে মির্জা আব্বাসসহ ১৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
কিন্তু ভোটের আগের দিন রাতে প্রশাসনের যোগসাজসে ১৪ দলীয় প্রার্থীর নৌকা প্রতীকে সিল মেরে ব্যালেট বাক্স ভর্তি করে রাখা হয়। কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখান করে। নির্বাচনে ওয়ার্কাস পার্টির রাশেদ খান মেননকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত ইসলামী, বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টিসহ বেশিরভাগ দল এই নির্বাচন বর্জন করে। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে এই আসনটি ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম ওয়ার্কাস পার্টিকে ছেড়ে দেয়নি আওয়ামী লীগ । মনোনয়ন দেয়া হয় আ. ফ.ম বাহাউদ্দিন নাসিমকে। ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ৮ মাসের মাথায় গণ অভুন্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হয়েছেন এনসিপির প্রথম সারির নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী। যদিও গত বছর ৩০শে জানুয়ারি নিউজ টুয়েন্টিফোরকে দেয়া এক স্বাক্ষাৎকারে জামায়াতে ইসলামীকে দিল্লীর এক্সটেনশন বলে অভিহিত করেন।
নিয়তির নির্মম পরিহাস জামায়াতে ইসলামীর ভোট ব্যাংককে সম্বল করে এনসিপির এই নেতা এখন জাতীয় সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। শুধু তাই নয়-জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন পেয়ে এনসিপির প্রভাবশালী নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে কটাক্ষ করে বলেছেন, তার জয়ের চেয়ে হারার রেকর্ড বেশি।
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা- ৮ (রমনা-মতিঝিল-পল্টন) সংসদীয় আসনটি একক কোন রাজনৈতিক দলের ঘাঁটি নয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা সমানে সমান। কিন্তু কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না আওয়ামী লীগ। যা বিএনপি প্রার্থীকে বাড়তি সুবিধা দিবে। এনসিপির কোন সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। জামায়াতে ইসলামীর ভোট ব্যাংকই দলটির একমাত্র ভরসা। সেই ক্ষেত্রে বিএনপি মির্জা আব্বাস এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীকে বিপুল ভোটে হারিয়ে বিজয়ী হবেন। এছাড়া জামানত হারাতে পারেন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মডেল মেঘনা আলম এমনটাই মনে করেন দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পরিচালিত বিএনএ নিউজ টুয়েন্টি ফোর এর জরিপে অংশগ্রহণকারি বেশিরভাগ ভোটার।
বিএনএনিউজ/ সৈয়দ সাকিব/এইচ.এম।
![]()
